Header Ads

Header ADS

সংস্কৃতি: মানবতা চাষাবাদের শিল্প


সংস্কৃতি শব্দের অর্থ হলো চাষাবাদ। আর বর্তমান সময়ে একে যখন এককভাবে ব্যবহৃত হয়, তখন তাকে মূলত মানব মনের চাষাবাদ বোঝানো হয়। তবে ইসলামী সংস্কৃতি অন্যান্য সংস্কৃতি থেকে এদিক থেকে ভিন্ন যে, এটা কখনোই ব্যক্তি বা ব্যক্তিগোষ্ঠীর উন্নয়নকে চূড়ান্ত লক্ষ্য হিসেবে গ্রহণ করে না। ইসলামী সংস্কৃতির লক্ষ্য শুরু থেকেই সুস্পষ্ট এবং সবার সামনে প্রকাশিত—এটি কেবল ব্যক্তিগত বা গোষ্ঠীগত উন্নয়ন নয়, বরং সমগ্র মানবজাতির পরিপূর্ণ বিকাশকে লক্ষ্য করে।

কোনো দেশের শিল্পকর্ম বা সাহিত্যকর্ম যতই উন্নত হোক না কেন, যদি সেখানে অন্যায়, অবিচার ও অসহিষ্ণুতা বিরাজ করে, তাহলে সেগুলোকে ইসলামের সাফল্য বা প্রতিনিধিত্ব বলা যাবে না। যুদ্ধের  জয় কিংবা শান্তি, তা যতই গৌরবময় হোক না কেন, ইসলামের ফসল হিসেবে দাবি করা যাবে না।

ইসলামের লক্ষ্য আরও বিস্তৃত, আরও মহান। এর লক্ষ্য হলো সার্বজনীন মানব ভ্রাতৃত্ব প্রতিষ্ঠা। তবুও, ইসলাম একটি ধর্ম হিসেবে ব্যক্তিগত আত্মশুদ্ধি এবং জাতিগত উন্নয়নের জন্য যে উৎসাহ দেয়, তা অন্য যেকোনো ধর্মের চেয়ে বেশি। আর যখন ইসলাম ইতিহাসে একটি শক্তি হিসেবে আবির্ভূত হয়, তখন সে এমন সংস্কৃতিক ফলাফল তৈরি করেছে যা অন্য যেকোনো ধর্ম, সভ্যতা বা দর্শনের সৃষ্টির সঙ্গে তুলনীয়।

একজন মুসলমান বিস্মিত না হয়ে পারেন না, পশ্চিমা বিশ্বে শিল্প ও সাহিত্যকে যেভাবে প্রায় উপাসনার মতো গুরুত্ব দেওয়া হয়, যেন এগুলোই মানব জীবনের চূড়ান্ত লক্ষ্য এবং এগুলোর সৃষ্টি করাই মানুষের সর্বোচ্চ সাফল্য! অথচ ইসলামের দৃষ্টিতে এগুলো সংস্কৃতির গৌণ বা পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া মাত্র, মূল লক্ষ্য নয়।

মুসলমানরা সাহিত্য, শিল্প বা বিজ্ঞানের সাফল্যকে অবজ্ঞা করে—এমন নয়, এবং তাদের কখনো তা করা উচিতও নয়। তবে তারা এসবকে দেখে পথচলায় প্রাপ্ত আশীর্বাদস্বরূপ—কখনো তা উদ্দেশ্য অর্জনের সহায়ক, আবার কখনো পথিকের ক্লান্তি নিবারণের উপায় হিসেবে। কিন্তু মুসলমানরা কখনো এই সহায়তাকে বা সাময়িক বিনোদনকে উপাস্যরূপে গ্রহণ করে না।

ইসলামের জ্ঞান-বিজ্ঞান, শিল্পকলা ও সাহিত্যে যেটুকু অবদান আছে, তা এই দুই শিরোনামের মধ্যেই পড়ে—সহায়তা এবং বিনোদন। এর মধ্যে কিছু কিছু, যেমন উৎকৃষ্ট কবিতা ও স্থাপত্যশিল্প, এই দুই ক্ষেত্রেই পড়ে। তবে এই সকল সৃষ্টি ও কর্মকাণ্ডের পেছনে লক্ষ্য থাকে এক, দিকনির্দেশক একজন, এবং গন্তব্যও এক।
নেতা হলেন রাসূলুল্লাহ ﷺ,
দিকনির্দেশনা হলো পবিত্র কুরআন,
আর গন্তব্য হলো আল্লাহ

“ইসলামী সংস্কৃতি” বলতে আমি এমন সংস্কৃতিকে বোঝাই না, যা কোনো নির্দিষ্ট সময়ে মুসলমান পরিচয়ধারী জনগোষ্ঠী অর্জন করেছে—যা-ই হোক না কেন তার উৎস। বরং আমি বোঝাতে চাই সেই সংস্কৃতিকে, যা একটি ধর্ম দ্বারা নির্ধারিত, এবং যার স্পষ্ট লক্ষ্য হলো মানবজাতির উন্নতি

কেউ যদি পবিত্র কুরআন অধ্যয়ন করে থাকে, সে কখনো অস্বীকার করতে পারবে না যে, কুরআন এমন মানুষের জন্য দুনিয়া ও আখিরাতে সফলতার প্রতিশ্রুতি দেয়, যারা এর নির্দেশনার ওপর আমল করে ও এর বিধান মেনে চলে। কুরআনের লক্ষ্য কেবল কোনো একটি গোষ্ঠীর উন্নয়ন নয়, বরং সার্বিক মানবজাতির সফলতা। আর এই সফলতা অর্জিত হবে মানুষের প্রাকৃতিক প্রতিভা ও সক্ষমতার চর্চা ও বিকাশের মাধ্যমে

যদি মুসলিম সমাজে কোনো উন্নয়ন বা পরিবর্তন ঘটে যা কুরআনের অনুমোদিত নয়, বা রাসূলুল্লাহ ﷺ-এর কোনো স্পষ্ট নির্দেশনার সঙ্গে সঙ্গতিপূর্ণ নয়, তাহলে তা অনৈসলামী, এবং এর উৎস খুঁজতে হবে ইসলামী কাঠামোর বাইরে কোথাও। মুসলমানদের পক্ষ থেকে এমন কিছু গ্রহণ করে সাফল্যের আশা করা ঠিক নয়—যদিও এমন কিছু সবসময় সাফল্যের পরিপন্থী হবে, এমন নয়।

যে কোনো উন্নয়ন যদি কুরআনের স্পষ্ট বিধানের পরিপন্থী হয় এবং নবী (সা.)-এর শিক্ষা ও আদর্শের বিরুদ্ধে যায়, তবে তা ইসলামবিরোধী; এমন উন্নয়ন অবশ্যই ব্যর্থতার দিকে নিয়ে যায়, এবং মুসলমানরা যদি এমন কিছু গ্রহণ করে তবে তারা নিশ্চিতভাবে ধ্বংসের পথই বেছে নেয়।

ইসলামের প্রারম্ভিককালে কিছু কিছু শিল্পকর্ম নিরুৎসাহিত করা হয়েছিল, কারণ সেগুলোর সঙ্গে ছিল মূর্তিপূজার সম্পর্ক — সেই জাহিলি আরবদের পৈশাচিক উৎসবের অবিচ্ছেদ্য অংশ, যা সম্পূর্ণ নির্মূল করা ছিল জাতির অগ্রগতির জন্য অপরিহার্য। কিন্তু কিছু শিল্পরূপকে নিরুৎসাহিত করা এবং অন্যগুলোকে উৎসাহিত করা, এই দুইই ছিল গৌণ বিষয় — যেমন শিল্পকর্মগুলোও গৌণই ছিল। ইসলামী সংস্কৃতির লক্ষ্য ছিল না মানুষের জীবনের আনুষঙ্গিক বিষয়গুলোকে শোভিত ও পরিশীলিত করা; বরং লক্ষ্য ছিল পুরো মানবজীবনকে সৌন্দর্যমণ্ডিত ও উন্নত করা।

বর্তমানে পাশ্চাত্যে এমন একটি বৃহৎ এবং প্রজ্ঞাসম্পন্ন চিন্তাশৈলী গড়ে উঠেছে, যারা মনে করে যে কোনো সমাজের একটি ক্ষুদ্র অংশ যদি উৎকৃষ্ট শিল্পকর্ম সৃষ্টি করে, তবে সেটাই সেই সমাজের সভ্যতা ও সংস্কৃতিকে প্রশংসার যোগ্য করে তোলে। যদিও সেই সমাজের বিশাল সংখ্যাগরিষ্ঠ মানুষ একটি সমাজব্যবস্থার কারণে জীর্ণ ও অবমাননাকর জীবনযাপন করতে বাধ্য হয়। এমনকি কিছু প্রাজ্ঞ মহল এমন বিশ্বাসও পোষণ করে যে, একটি জাতির ক্ষুদ্রসংখ্যক মানুষের সৃষ্টি করা মনোমুগ্ধকর শিল্পকর্মই যেন যথেষ্ট অজুহাত—সেই জাতির বিপুল সংখ্যাগরিষ্ঠ মানুষকে চিরকাল কদর্যতা, দাসত্ব ও অবমাননার জীবনযাপনে বাধ্য রাখার জন্য।

আপনাদের অনেকে নিশ্চয়ই কয়েক বছর আগে ইংরেজি সংবাদপত্রে একটি আলোচনার কথা মনে আছে। প্রশ্ন ছিল: ধরুন একটি ঘরে একটি অমূল্য গ্রিক মূর্তি রয়েছে — যা অনন্য এবং অপরিবর্তনীয় — সেই ঘরে একটি জীবন্ত শিশু রয়েছে; হঠাৎ ঘরে আগুন লাগলে, কেবল একটি জিনিসই উদ্ধার করা সম্ভব: আপনি কোনটি বাঁচাবেন? অনেক জ্ঞানী ও উচ্চপদস্থ ব্যক্তি লিখেছিলেন, সেই মূর্তিটিই উদ্ধার করা উচিত এবং শিশুটিকে পুড়ে মরতে দেওয়া উচিত; তাদের যুক্তি ছিল, প্রতিদিন লাখ লাখ শিশু জন্ম নেয়, কিন্তু ঐতিহাসিক গ্রিক শিল্পকর্মটি আর কখনো তৈরি করা যাবে না। এটি এমন একটি মতবাদ, যা কোনো মুসলমানই গ্রহণ করতে পারে না — আর এটি হলো আধুনিক যুগের সর্বোচ্চ পর্যায়ের মূর্তিপূজা।

ইসলাম মানবজাতির জন্য এক উজ্জ্বল ভবিষ্যতের স্বপ্ন দেখে এবং তার জন্য কাজ করে; আর প্রতিটি মুসলমান নিজের জীবনকে আল্লাহর সেবায় (যেটিই মানবতার সেবা) উৎসর্গ করলেও, সে কখনো কোনো মানবজীবনকে — যত সামান্যই হোক না কেন — মানুষের তৈরি কোনো কিছুর জন্য বলি দেওয়ার কথা চিন্তাও করে না।

শিল্পকর্মের প্রতি যে একপ্রকার আরাধনা সৃষ্টি হয়েছে, তা আল্লাহর দিকনির্দেশনা ও মানবজাতির প্রতি তাঁর উদ্দেশ্যের ওপর বিশ্বাসের অভাবেরই ফল। এই শিল্পকর্মগুলো মানবজাতির শতাব্দীর পর শতাব্দীর সেরা সৃষ্টি; যুক্তি দিয়ে বলা হচ্ছে যে, সৌন্দর্য হারিয়ে যাচ্ছে, মানুষ অধঃপতনের দিকে যাচ্ছে — তাই আমাদের অতীতের এই সৃষ্টিগুলোর মধ্যেই শেষ আদর্শ খুঁজে নিতে হবে। এই দৃষ্টিভঙ্গি একধরনের নৈরাশাবাদ। আর ইসলাম নৈরাশাবাদ নয়, ইসলাম আশাবাদী — তবে সেটি ভলতেয়ারের ব্যঙ্গাত্মক চরিত্র ড. প্যাংলসের মতো অন্ধ আশাবাদ নয়, যে বলত: “Tout est pour le mieux dans le meilleur des mondes possibles.” — "সবই মঙ্গলের জন্য, এই সর্বোত্তম পৃথিবীতে।" এ ধরনের মন্তব্য অনেকের কাছে আশাবাদ মনে হলেও, আসলে তা নিয়তিবাদের বহিঃপ্রকাশ — আর নিয়তিবাদ একপ্রকার নৈরাশাবাদ। ইসলাম নিয়তিবাদ নয়।

হ্যাঁ, আমি এই কথাটি পুনরায় বলছি—মুসলমানদের নিয়তিবাদ (fatalism) নিয়ে যত কথাই বলা হোক না কেন, ইসলাম প্রচলিত অর্থে কোনোভাবেই নিয়তিবাদী নয়। ইসলাম মানুষকে প্রচলিত অবস্থাকে একটি অনিবার্য মন্দ হিসেবে মেনে নিতে বলে না; বরং সে আদেশ দেয়—মানুষ যেন কখনোই উন্নতির প্রচেষ্টা থামিয়ে না দেয়।

ইসলাম এমন একটি ধর্ম, যার মূল লক্ষ্যই মানব জাতির অগ্রগতি সাধন; আর এ লক্ষ্য অর্জনের উপায় হিসেবে ইসলাম বহু নির্দেশ ও নিষেধাজ্ঞা প্রদান করেছে, যা মানুষের দৈনন্দিন জীবন, সামাজিক জীবন, রাজনীতি এমনকি মন ও আত্মার সকল অনুপ্রেরণার ক্ষেত্রকেও অন্তর্ভুক্ত করে। এই নির্দেশনা ও নিষেধাজ্ঞাগুলোকে একটি পূর্ণাঙ্গ সামাজিক ও রাজনৈতিক ব্যবস্থায় রূপ দেওয়া হয়েছে। এটি একটি বাস্তবায়নযোগ্য ব্যবস্থা, কারণ ইতিহাসের বিস্ময়কর সত্য হলো—ইহা বাস্তবে প্রয়োগ করা হয়েছে, এবং তা এমন সফলতার সঙ্গে, যা ইতিহাসকে বিস্ময়ে অভিভূত করেছে।

অনেক লেখক ইসলামের এই অভাবনীয় সাফল্যকে অস্বীকার করতে গিয়ে এর পেছনে বাহ্যিক কারণ খুঁজে বের করার চেষ্টা করেছেন—যেমন: আশপাশের জাতিগুলোর দুর্বলতা, তলোয়ারের শক্তি এবং সময়ের সরল বিশ্বাস ইত্যাদি। কিন্তু তারা এই বাস্তবতাকে কীভাবে ব্যাখ্যা করবেন যে, যতদিন মুসলমানরা আল্লাহর শরীয়তের একটি নির্দিষ্ট বিধান পুরোপুরি অনুসরণ করেছে, ততদিন তারা সে ক্ষেত্রেই সফলতা অর্জন করেছে; আর যখনই তারা তা অবহেলা করেছে, তখনই ব্যর্থতাও এসেছে? আবার, কোনো অমুসলিম জাতি যখন ঐ একই বিধান অনুসরণ করেছে, তারাও সেই ক্ষেত্রেই সফলতা অর্জন করেছে—এর ব্যাখ্যা আর কী হতে পারে? অর্থ্যাৎ কুরআন ও রাসূলের (সা.) নির্দেশাবলিই হল সমগ্র মানবজাতির জন্য প্রযোজ্য স্বাভাবিক ও চিরন্তন বিধান—যে বিধান লঙ্ঘন করলে শুধু ব্যক্তির নয়, বরং গোটা মানবজাতির জন্য বিপদ ডেকে আনে।

এই বিধানগুলো মানুষ নিজে নিজে ব্যক্তিগত পরীক্ষা-নিরীক্ষার মাধ্যমে আবিষ্কার করতে পারে না বলেই সেগুলো একজন নবীর মাধ্যমে প্রকাশ করার প্রয়োজন ছিল; যদিও এই বিধানগুলো ঠিক ততটাই স্বাভাবিক ও বাস্তব, যতটা স্বাভাবিক সেই পদার্থবিজ্ঞানীয় নিয়মগুলো, যেগুলো আমাদের দৈনন্দিন অস্তিত্বকে নিয়ন্ত্রণ করে এবং যেগুলো কেউ অস্বীকার করার কথা কল্পনাও করে না।

অন্যান্য ধর্মসমূহ সাধারণত প্রতিশ্রুতি দেয় পরকালে সফলতার, যদি মানুষ এ জীবনে সংযম ও কষ্টসাধ্য জীবনযাপন করে নিজেকে সেই জীবনের যোগ্য করে তোলে। কিন্তু ইসলাম উভয় জীবনে—দুনিয়াতে এবং পরকালে—সফলতার অঙ্গীকার করে, যদি মানুষ নির্দিষ্ট কিছু আইন ও সহজবোধ্য আচরণবিধি অনুসরণ করে। প্রকৃত মুসলমানের কাছে পার্থিব জীবন ও পরকালীন জীবনের মধ্যে কোনো বিভাজন থাকে না। কারণ আল্লাহ হচ্ছেন আসমান ও জমিনের মালিক—তিনি এই জগতেরও অধিপতি, পরকালীন জগতেরও মালিক। সত্যিকারের মুসলমানের কাছে পরকালীন জীবনের সূচনা হয় পৃথিবী থেকেই—মৃত্যুর পরে নয়। বরং তখনই শুরু হয়, যখন সে আত্মসমর্পণ করে আল্লাহর ইচ্ছার সামনে—যা রাসূল (সা.) বুঝাতে চেয়েছিলেন এই হাদীসের মাধ্যমে:
موتوا قبل ان تموتوا
“মরে যাও, মৃত্যুর আগে।”

ইসলাম যে পার্থিব সাফল্যের প্রতিশ্রুতি দেয়, তা কোনো ব্যক্তির অন্য ব্যক্তির ওপর বিজয় নয়; কোনো জাতির অন্য জাতির ওপর জয়ী হয়ে তাদের হতাশায় নিমজ্জিত করে সফলতা অর্জন নয়; বরং এটি সমগ্র মানবজাতির সম্মিলিত ও সমতাভিত্তিক সাফল্য।

দিনে পাঁচবার, পৃথিবীর প্রতিটি মসজিদ থেকে আহ্বান ধ্বনিত হয়:
حى على الفلاح، حي على الفلاح
"এসো সফলতার দিকে! এসো সফলতার দিকে!"

এই "ফলাহ" শব্দটির অর্থ হচ্ছে—“চাষাবাদ করে, পরিচর্যার মাধ্যমে সফলতা অর্জন।” আবার একটি আরবি শব্দ মুসলমানদের মধ্যে বহুল ব্যবহৃত, যার মূল অর্থ অনেকেই ভুলে গেছেন, সেটি হলো: زكوة (যাকাত)—যার অর্থ: “কাটছাঁট করে পরিশুদ্ধ করা,” বা “সোজাভাবে বৃদ্ধি ঘটানো।”

জাকাত হলো "গরিবের হক"। একে কুরআনে বহুবার অতি গুরুত্বের সঙ্গে প্রার্থনার সমান মর্যাদায় আদায় করার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। জাকাত ছিল এমন এক ব্যবস্থা, যা মুসলিম সমাজে সত্যিকার অর্থে এক উন্নয়নধর্মী ও শৃঙ্খলাপূর্ণ অগ্রগতির সূচনা করেছিল।

রাসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বলেছেন:
"ধনীদের কাছ থেকে কর (জাকাত) আদায় করে গরিবদের মধ্যে তা বিতরণ করতে হবে।"

যখন এই কর নিয়মিত আদায় করা হতো, তখন মুসলিম সমাজ এমন অবস্থায় পৌঁছেছিল যে, জাকাত বিতরণের দায়িত্বে নিয়োজিত ব্যক্তিরা দূর-দূরান্তে খুঁজেও এমন কাউকে খুঁজে পেতেন না, যে প্রকৃতপক্ষে জাকাত পাওয়ার উপযুক্ত। আর তাই তখন জাকাতের অর্থ ব্যয় করা হতো জনকল্যাণমূলক কাজে।

পবিত্র কুরআনে বলা হয়েছে:

قَدْ أَفْلَحَ مَن زَكَّاهَا وَقَدْ خَابَ مَن دَسَّاهَا
“সে-ই সফল, যে (তার আত্মাকে) পরিশুদ্ধ করে;
আর সে-ই ব্যর্থ, যে তাকে দুষিত করে।”

আবার বলা হয়েছে:

قَدْ أَفْلَحَ مَن تَزَكَّىٰ وَذَكَرَ ٱسْمَ رَبِّهِۦ فَصَلَّىٰ
“সে-ই সফল, যে নিজেকে পরিশুদ্ধ করে এবং তার প্রভুর নাম স্মরণ করে, অতঃপর সালাত আদায় করে।”

অনেকে হয়তো ভাববেন, এসব কেবল ধর্মীয় উচ্চারণ, বাস্তব জীবনের সঙ্গে বিচ্ছিন্ন। কিন্তু ইসলাম বাস্তবধর্মী— কেবল তত্ত্বনির্ভর ধর্ম নয়। এই আয়াতগুলো নিছক ধর্মীয় শব্দবন্ধ হয়ে থাকেনি। বরং একটি সুবিন্যস্ত ব্যবস্থার মাধ্যমে ইসলাম এই আদর্শগুলোকে বাস্তবে রূপ দিয়েছে —যা ইতিহাসে সর্বপ্রথম এবং সর্ববৃহৎ সমাজকল্যাণমূলক ব্যবস্থা হিসেবে শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরে মুসলিম বিশ্বের সামাজিক সমস্যাগুলোকে কার্যকরভাবে সমাধান করেছে।

কুরআন আমাদের জানায় যে, সত্যিকারের ধর্ম হচ্ছে ব্যবহারিক, শুধু আনুষ্ঠানিক বা তাত্ত্বিক নয়। যেমন:

لَيْسَ ٱلْبِرَّ أَن تُوَلُّوا۟ وُجُوهَكُمْ قِبَلَ ٱلْمَشْرِقِ وَٱلْمَغْرِبِ وَلَـٰكِنَّ ٱلْبِرَّ مَنْ ءَامَنَ بِٱللَّهِ وَٱلْيَوْمِ ٱلْـَٔاخِرِ وَٱلْمَلَـٰٓئِكَةِ وَٱلْكِتَـٰبِ وَٱلنَّبِيِّۦنَ وَءَاتَى ٱلْمَالَ عَلَىٰ حُبِّهِۦ ذَوِى ٱلْقُرْبَىٰ وَٱلْيَتَـٰمَىٰ وَٱلْمَسَـٰكِينَ وَٱبْنَ ٱلسَّبِيلِ وَٱلسَّآئِلِينَ وَفِى ٱلرِّقَابِ وَأَقَامَ ٱلصَّلَوٰةَ وَءَاتَى ٱلزَّكَوٰةَ ۗ وَٱلْمُوفُونَ بِعَهْدِهِمْ إِذَا عَـٰهَدُوا۟ ۖ وَٱلصَّـٰبِرِينَ فِى ٱلْبَأْسَآءِ وَٱلضَّرَّآءِ وَحِينَ ٱلْبَأْسِ ۗ أُو۟لَـٰٓئِكَ ٱلَّذِينَ صَدَقُوا۟ ۖ وَأُو۟لَـٰٓئِكَ هُمُ ٱلْمُتَّقُونَ

“ধর্মপরায়ণতা শুধু এটুকু নয় যে, তোমরা তোমাদের মুখ পূর্ব বা পশ্চিম দিকে ফিরিয়ে দাও; বরং প্রকৃত ধার্মিক সে, যে বিশ্বাস করে আল্লাহ, পরকাল, ফেরেশতাগণ, কিতাবসমূহ ও নবীগণের প্রতি এবং আল্লাহর প্রতি ভালোবাসা থেকেই নিজের সম্পদ দান করে আত্মীয়স্বজন, এতিম, অভাবগ্রস্ত, পথচারী, ভিক্ষুক ও দাসমুক্তির জন্য; সালাত প্রতিষ্ঠা করে এবং জাকাত প্রদান করে; যারা অঙ্গীকার করলে তা পূর্ণ করে এবং দুঃখ-কষ্ট ও সংকটে ধৈর্য ধারণ করে — এরা-ই সত্যনিষ্ঠ এবং এরা-ই পরহেজগার।”

কুরআনে আমরা বহুবার এই বাক্যটি পাই:

الَّذِينَ آمَنُوا۟ وَعَمِلُوا۟ ٱلصَّـٰلِحَـٰتِ
“যারা ঈমান আনে ও সৎকর্ম করে।”

“যারা ঈমান আনে কিন্তু কিছুই করে না”— এ ধারণা ইসলামে নেই।
“যারা ঈমান আনে কিন্তু মন্দ কাজ করে”— এটি ইসলামের দৃষ্টিতে অকল্পনীয়।

কারণ ইসলাম মানে হচ্ছে আল্লাহর ইচ্ছার প্রতি আত্মসমর্পণ এবং আল্লাহর আইনের প্রতি আনুগত্য, যা হলো প্রচেষ্টার আইন; অলসতার বা নিষ্ক্রিয়তার নয়।

মূল: মুহাম্মদ মারমাডিউক পিকথাল

অনুবাদ: সালমান রিয়াজ

No comments

Powered by Blogger.