কুরআনে সাহিত্যচর্চার স্বরূপ
সাহিত্য সমাজের দর্পণ। মানুষের চেহারা যেভাবে আয়নায় হুবহু প্রকাশ পায়, তেমনি সাহিত্যে ফুটে ওঠে সমাজের চিত্র। সমাজের রূপরেখা। মানুষের দৈনন্দিন কাজকর্ম, চিন্তা-ভাবনা, আনন্দ-বেদনা, হাসি-কান্না, ইতিহাস-ঐতিহ্য, ধর্মবিশ্বাস-অবিশ্বাস, দর্শন-ভাবনা, বোধ-কল্পনা, শিল্প-সৌন্দর্য, মাধুর্য-ঔদার্য, দ্বন্দ্ব-সংঘাত ও সামগ্রিক কর্মপদ্ধতি-সবকিছুই সাহিত্যে প্রতিবিম্বিত হয়। মানবজীবনের প্রতিটি অনুপ্রসঙ্গ নিয়েও আলোচনা, পর্যালোচনা, সমালোচনা হয় এই সাহিত্যে। তাই সাহিত্যকে জীবনালোচনাও বলা হয়। মানুষের মনন ও বোধ জাগিয়ে তোলা এবং সত্য ও সুন্দরের সন্ধান দেওয়া সাহিত্যের কাজ। আর যেখানে সত্য ও সুন্দরের চর্চা এবং অনুসন্ধান রয়েছে সেখানেই রয়েছে ইসলাম। অর্থ্যাৎ ইসলামও সাহিত্যচর্চাকে অনুমোদন দেয়। অনুপ্রেরণা জোগায়। পবিত্র গ্রন্থ আল-কুরআনে সাহিত্যচর্চার স্বরূপ উপস্থাপনই আমার এ প্রবন্ধের আলোচ্য বিষয়।
এক.
সাহিত্যের রয়েছে নানা অনুষঙ্গ। যার শুরুটা ভাষা দিয়ে। ভাষা ভাব প্রকাশের মাধ্যম। এরপর ভাষা থেকেই উৎপত্তি হয়েছে কবিতা, ছড়া, গান, গল্প, উপন্যাস, নাটক। যাকে আমরা এক কথায় সাহিত্য বলি। অর্থ্যাৎ ভাষার অলংকৃত রূপ হলো সাহিত্য। আর এই সাহিত্য বিভিন্ন রং-বেরংয়ের মলাটে বন্দী হলেই তা হয় বই।
আল্লাহ রব্বুল আলামীন মানুষকে সৃষ্টি করে সর্বপ্রথম তাকে ভাষা শিখিয়েছেন। ‘দয়াময় রহমান আল্লাহ! কুরআন পাঠ শেখালেন; মানুষ সৃষ্টি করলেন; তাকে ভাষা শিক্ষা দিলেন।’ (সূরা আর-রহমান, আয়াত: ১-৪)। পবিত্র কুরআনে আল্লাহ তা’আলা আরও বলেন, ‘আর তাঁর নিদর্শনাবলির মধ্যে রয়েছে আকাশমণ্ডলী ও পৃথিবীর সৃষ্টি এবং তোমাদের ভাষা ও বর্ণের বৈচিত্র্য। এতে জ্ঞানীদের জন্য অবশ্যই বহু নিদর্শন রয়েছে।’ (সূরা আর-রুম, আয়াত: ২২)।
আল্লাহ তা’য়ালা তার নবী ও রাসূলদের ওপর কিতাব বা গ্রন্থ নাজিল করেছেন তার স্বজাতির ভাষায়। যাতে ওই ভাষাভাষির মানুষ সহজে তা বুঝতে পারে। কুরআন বলছে, ‘আমি প্রত্যেক রাসূলকেই তাঁর স্বজাতির ভাষাভাষী করে পাঠিয়েছি তাদের নিকট পরিষ্কারভাবে (আমার ওহী) ব্যাখ্যা করার জন্য।’ (সূরা ইবরাহিম, আয়াত: ৪)। একইভাবে মহাগ্রন্থ আল-কুরআনকে আরবি ভাষায় নাজিল করার কারণ ব্যাখ্যা করে আল্লাহ তা’আলা বলেন, ‘আমি অবতীর্ণ করেছি আরবি ভাষায় কুরআন, যাতে তোমরা বুঝতে পারো।’ (সূরা ইউসুফ, আয়াত: ২)। এর একটি অর্থ হলোÑ ব্যাকরণগত জটিলতার দিক থেকে সবচেয়ে সহজ ও বোধগম্য হলো আরবি ভাষা। এ কারণেই আল্লাহ তা’য়ালা কুরআনকে আরবি ভাষায় নাজিল করেছেন। আর স্বজাতির ভাষা বা মাতৃভাষা শেখা এবং চর্চা করা মহান আল্লাহ প্রদত্ত নিয়ম। যুগে যুগে তার প্রেরিত পুরুষরাও এই নিয়মের অনুসারী ছিলেন। তাদের উম্মতরাও দেখানো সেই পথে চলেছেন। শেষ নবী হযরত মুহাম্মদ (সা.) এর উম্মত হিসেবে আমাদেরও উচিত মাতৃভাষার প্রতি শ্রদ্ধাশীল হওয়া এবং তা বেশি বেশি চর্চা করা।
দুই
পৃথিবীর প্রায় প্রতিটি ভাষার সাহিত্যই কবিতাকে আশ্রয় করে গড়ে উঠেছে। আর সাহিত্যের একটি প্রাচীন রূপ হলো ছড়া। আরবি সাহিত্যও কবিতা-ছড়াকে কেন্দ্র করেই রচিত। রাসূল (সা.)-এর নবুয়তপূর্ব ও পরবর্তী সময়ে আরবে কাব্যধারাটিই ছিল অত্যধিক প্রচলিত। শৈল্পিক ও নান্দনিকতায় ঋদ্ধ। পবিত্র কুরআনকেও আল্লাহ তা’য়ালা কাব্যিক ছন্দে রচনা করেছেন। কুরআনের মাক্কী সূরাগুলোর দিকে লক্ষ করলে তার প্রমাণ মেলে। কুরআনে কবিতা প্রসঙ্গ বোঝাতে ‘শায়ের’ শব্দটি ব্যবহৃত হয়েছে।
কাব্য ও সাহিত্যচর্চার ব্যাপারে ইসলামের দৃষ্টিভঙ্গী কী?Ñ তার বর্ণনা দেয়া হয়েছে সূরা আশ-শুআরায়। আশ-শুআরা অর্থ কবিরা। এ সূরার নামকরণের মাধ্যমেই বোঝা যায়, ইসলামে কাব্য ও সাহিত্যের গুরুত্ব কতখানি। আল্লাহ তা’য়ালা বলেন, ‘বিভ্রান্তরা কবিদের অনুসরণ করে। আপনি কী দেখেন না, তারা প্রতিটি উপত্যকায় উভ্রান্ত হয়ে ঘুরে বেড়ায় এবং এমন সব কথাবার্তা বলে, যা তারা করে না। তবে তাদের কথা ভিন্ন, যারা বিশ্বাস স্থাপন করে, সৎকর্ম সাধন করে ও আল্লাহকে অত্যধিক স্মরণ করে এবং নিপীড়িত হলে প্রতিশোধ গ্রহণ করে।' (সূরা আশ-শুআরা, আয়াত : ২২৪-২২৭)
বুখারি শরিফের ব্যাখ্যাগ্রন্থ ফাতহুল বারীতে আছে, সূরা আশ-শুয়ারার এ আয়াত নাজিল হওয়ার পর হযরত আবদুল্লাহ ইবনে রাওয়াহা, হযরত হাসসান বিন সাবিত, হযরত কাব ইবনে মালিক (রা.) প্রমুখ সাহাবী অশ্রুসিক্ত বদনে রাসূল (সা.)-এর দরবারে উপস্থিত হয়ে বলেন, হে আল্লাহর রাসূল! আল্লাহ তা’য়ালা এ আয়াত অবতীর্ণ করেছেন। কিন্তু আমরা তো কাব্যচর্চা করি। এখন আমাদের কী হবে? রাসূল (সা.) বলেন, আয়াতের শেষাংশ তিলাওয়াত করো। এ আয়াতের উদ্দেশ্য হলো, তোমাদের কাব্যচর্চা যেন সার্থক হয় এবং অনর্থক ও ভ্রান্ত উদ্দেশ্য-আশ্রিত না হয়। কাজেই তোমরা হলে আয়াতের শেষাংশে উল্লিখিত কবিদের অন্তর্ভুক্ত।’
পবিত্র কুরআনের অন্যতম প্রধান বৈশিষ্ট্য হলোÑকোনো বক্তব্যের ওপর ফোকাস করতে প্রথমে নেতিবাচক দিক এবং পরে ইতিবাচক দিকটি উপস্থাপন করা হয়। নেতিবাচক বক্তব্যের মাধ্যমে ইতিবাচক প্রসঙ্গটি দেদীপ্যমান করার কুরআনিক বর্ণনাশৈলীর মাধ্যমে আয়াতগুলোতে কাফের কবিদের নিন্দা ও মুমিন কবিদের প্রশংসা করা হয়েছে। কুরআনের তাফসিরবিশাদরা একমত যে, এ আয়াতগুলোর মাধ্যমে কাব্যচর্চাকে নিরুৎসাহিত করা হয়নি। বরং ঈমানদার কবিদের দিকনির্দেশনা দিয়ে তাদের কাব্যচর্চা আরও পরিশীলিত ও বেগবান করতে উৎসাহ দেয়া হয়েছে। আয়াতের প্রথমাংশে ‘বিভ্রান্তরা কবিদের অনুসরণ করে’ বলতে অবিশ্বাসী কবিদের বুঝানো হয়েছে। আর আয়াতের শেষাংশে বিশ্বাসী কবিদের কাব্যচর্চা যেন অশুভ ও ভ্রান্ত উদ্দেশ্যপ্রণোদিত না হয়ে অধিক কল্যাণপ্রসূ ও পুণ্যময় হয়, বিশ্বাসের পরিপন্থি হয়, দেশ-জাতি ও মানুষের কল্যাণে হয়-সেই নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে।
বিশ্বনবী হযরত মুহাম্মদ (সা.) স্বয়ং কাব্যচর্চা করতেন। নবী করিম (সা.) স্বরচিত কবিতা পাঠ করেছেন গাজওয়ায়ে আহজাব বা খন্দকের যুদ্ধে। বিখ্যাত সাহাবী হযরত হাসসান বিন সাবিত (রা.) কাব্য রচনা করতেন। এমনকি তাকেসহ কাব বিন মালিক (রা.) ও আব্দুল্লাহ বিন রাওয়াহা (রা.)-কে কাফেরদের কবিতার জবাব দেয়ার জন্য মনোনীত করেছিলেন স্বয়ং রাসূল (সা.)। হজরত আয়েশা (রা.) কাব্যচর্চা করতেন। এভাবে ইসলামের সব যুগেই বিভিন্ন ভাষায় সাহিত্যচর্চা চলে আসছে। সাধক কবি ইমাম শরফুদ্দীন মুহাম্মাদ বুসিরী (রহ.) (১২১৩-১২৯০) রাসুলের (সা.) শানে নাত রচনা করে স্বপ্নযোগে লাভ করেছেন নবীজির বুরদা বা চাদর মুবারক। যে কারণে সে কাব্যের নাম হয়েছে ‘কাসিদা বুরদা’ বা উত্তরীয় কাব্য। যার পূর্ণ নাম হলো ‘আল কাওয়াকিবুদ দুররিয়্যাহ ফি মাদহি খায়রিল বারিয়্যাহ’।
এর দ্বারা স্পষ্ট যে, কাব্যচর্চা মন্দ কিছু নয়। তবে কবিতায় আল্লাহ তা’য়ালার অবাধ্যতা, আল্লাহর স্মরণ থেকে ভুলে থাকা, আল্লাহর সৃষ্টি-বিরুদ্ধ তত্ত্ব উপস্থাপন করা, ইসলামী আকীদা বিশ্বাসে সন্দেহ ও সংশয় প্রকাশ, অশ্লীল ও অশ্লীলতায় প্রেরণা দেয়া, মিথ্যাকে প্রশ্রয় দেয়া কবিতা নিন্দনীয়।
তিন
আধুনিক সাহিত্যে গানকেও সাহিত্যের অনুষঙ্গ হিসেবে বিবেচনা করা হয়। গানকে বলা হয় গীতিকাব্য। আর গীতিকাব্য হলো কবিতার একটা ধারা। অর্থ্যাৎ গানের প্রাথমিক স্তর হলো কবিতা। কোন কবিতাকে যখন সুর-তাল-লয়ের সংমিশ্রণে উপস্থাপন করা হয় তখন তাকে গান বলে। গানকে উপজীব্য করে এর সঙ্গে যোগ হয়েছে বাজনা বা বাদ্য। যা ইসলাম অনুমোদন করে না। কুরআনে মদ, জুয়া ও সুদকে যেভাবে সুস্পষ্টভাবে হারাম ঘোষণা করা হয়েছে, গিনা, নাগমা, সামারূপ গান বা সংগীত সম্মন্ধে সেরূপ নিষেধাজ্ঞা নেই।
অনেকেই সূরা লুকমানের ৬নং আয়াত উল্লেখ করে বলেন, কুরআনে গানকে হারাম করা হয়েছে। আসলেই কী তাই! কুরআন বলছে, ‘মানুষের মধ্যে কেউ কেউ অজ্ঞলোকদের আল্লাহর পথ হতে বিচ্যুত করার জন্য অসার বাক্য ক্রয় করে এবং আল্লাহর প্রদর্শিত পথ নিয়ে ঠাট্টা-বিদ্রুপ করে। ওদেরই জন্য রয়েছে অবমাননাকর শাস্তি।’ (সূরা লুকমান, আয়াত: ৬)
উক্ত আয়াতে আল্লাহ তা’য়ালা ‘লাহওয়া’ শব্দ ব্যবহার করেছেন। যার অর্থ খেলা, তামাশা, অসার কথা, অনর্থক কথা, অপ্রয়োজনীয় কথা ইত্যাদি। সংগীতের জন্য আরবী ভাষায় সবচেয়ে প্রচলিত শব্দ হলো গিনা, সামা, নাগমা ইত্যাদি। কিন্তু আল্লাহ তা’য়ালা এ শব্দগুলোর ব্যবহার করেননি। বরং লাহওয়া বলতে ওই গালগল্প, মুখরোচক খোশগল্প বা রসাত্মক বাক্যালাপ বুঝায়, যার বাস্তবিক ভিত্তি নেই। সেটা এই আয়াতের প্রেক্ষাপট দেখলে স্পষ্ট বুঝা যায়। যখন রাসুলের (সা.) ওপর কুরআনের আয়াত নাজিল হতে শুরু করে তখন সাহাবীরা তা মানুষকে আবৃত্তি বা পড়ে শোনাতেন। এতে কাফেররা ক্ষুব্ধ হয়ে বিভিন্ন রসাত্মক কথামালার মাধ্যমে লোকজনকে এ থেকে বিমুখ করার চেষ্টা করত। তাদের বাক্যালাপে মুগ্ধ হয়ে কোনো কোনো মুসলিমও কুরআন পাঠ থেকে বিমুখ হতো। এমন প্রেক্ষাপটেই এ আয়াতটি নাজিল হয়েছিল।
এতে প্রমাণ হয়, গানকে আল্লাহ হারাম করেননি যদি না সেটি খারাপ উদ্দেশ্যে হয় এবং এর সঙ্গে যুক্ত হয় বাজনা। যেমন, অসৎ উদ্দেশ্যে কুরআন তেলাওয়াতও হারাম। কুরাইশ সর্দারদের সঙ্গে রাসূল (সা.) এর গুরুত্বপূর্ণ আলোচনাকালে অন্ধ সাহাবী হযরত আব্দুল্লাহ ইবনে উম্মে মাকতুম এসে বারবার রাসুলের সান্নিধ্য লাভের অনুরোধ জানান। এরই প্রেক্ষাপটে আয়াত নাজিল হলো- সে (রাসূল) ভ্রুকুঞ্চিত করল এবং মুখ ফিরিয়ে নিল। কারণ তার নিকট অন্ধ লোকটি এসেছিল। (সূরা আবাসা, আয়াত: ১-২)। এই আয়াতকে পুঁজি করে মুনাফিকরা রাসূলকে (সা.) কটাক্ষ করত। মুনাফিক আব্দুল্লাহ ইবনে উবাই নামাযের ইমামতিতে বারবার এই সূরাটি তেলাওয়াত করতেন। তার উদ্দেশ্যে ছিলÑ বারবার এ সূরা পাঠ করে লোকের মনে রাসুলের (সা.) প্রতি বিদ্বেষ সৃষ্টি করা।
আর গানের সঙ্গে যখন বাজনা যুক্ত হবে তখন সেটি হারাম। রাসূল (সা.) বাজনাকে ‘শয়তানের বাঁশি’ হিসেবে আখ্যায়িত করেছেন। বর্তমানে ‘গান-বাজনা’ শব্দদ্বয় মিলিয়ে এটাকে ঢালাওভাবে আমরা হারাম বলি। কিন্তু গান ও বাজনাÑদুটি পৃথক শব্দ। তাওহীদ, রেসালাত, আখিরাত, ইসলামী মূল্যবোধ ও বিশ^াস, দেশ, মাটি, মানবকল্যাণকে উপজীব্য করে রচিত গান বা সংগীত, যা বাজনাবিহীন পরিবেশন বা গাওয়া হয়, তা ইসলামে নিষিদ্ধ নয়।
যেমন, আজানও এক প্রকারের সংগীত। এর মাধ্যমে মানুষকে কল্যাণের পথে, আল্লাহর পথে আহ্বান জানানো হয়। আজানের অমীয় ধ্বনি বা শব্দের সমষ্টিগুলো যদি কোন সুর-তাল-লয়ের ছাঁচে ফেলে উচ্চারিত না হয়ে সুর-তাল-লয়হীন উচ্চারিত হতো তাহলে তা মানুষকে অতটা আকৃষ্ট করত না। আজানের গীতিকার স্বয়ং আল্লাহ তা’য়ালা। (হযরত আব্দুল্লাহ ইবনে যায়েদ (রা.)-কে স্বপ্নযোগে আল্লাহ তা’য়ালা আজানের বাক্যগুলো শিখিয়ে দেন।) একইভাবে আজানের সুরকারও আল্লাহ তা’য়ালা। কারণ রাসূল (সা.) বলেছেন- ‘আল্লাহ তা’য়ালা কুরআনকে সাত কিরআতে অবতীর্ণ করেছেন। অতএব যেভাবে পড়তে সহজ হয় তোমার সেভাবে পাঠ কর। (সহীহ আবু দাউদ: ১৪৭৫)। অর্থ্যাৎ কুরআনিক আরবির জন্য সাত ধরনের সুর নির্ধারণ করে দিয়েছেন আল্লাহ। সুতারাং সেসময় কুরআনকে যেভাবে সহিহ-শুদ্ধ, সুললিতভাবে তেলাওয়াত করা হতো তেমনি আজানকেও সেভাবেই প্রচার করা হতো। আর এ আজানের প্রথম কণ্ঠশিল্পী হলেন হযরত বেলাল (রা.)। তাঁর কণ্ঠের মাধুর্যতার কারণেই রাসূল (সা.) তাকেই মুয়াজ্জিন হিসেবে বাছাই করেছিলেন।
চার
প্রাচীনকাল থেকেই কথাশিল্প বা গল্পবলা ও রচনা, সাহিত্যের একটি প্রভাবশালী শাখা। মানুষ স্বভাবতই গল্পপ্রিয়। বিচিত্র কাহিনী, ঘটনাপ্রবাহ, বিশেষ করে বিস্ময়কর কোনো দুর্ঘটনা কিংবা থ্রিলার গল্পের প্রতি মানুষের ঝোঁক বেশি। ধর্মীয় সাহিত্যে গল্পের ঐতিহ্য বেশ প্রাচীন। বিভিন্ন ধর্ম মানুষের হেদায়েতের উদ্দেশ্যে কিংবা মানুষকে জাগিয়ে তোলার লক্ষ্যে গল্পকে ব্যাপকভাবে কাজে লাগিয়েছে। পবিত্র কুরআনে শিক্ষনীয় বহু গল্পের অবতারণা করা হয়েছে সুন্দর এবং মার্জিতভাবে। আল্লাহ তা’য়ালা বলেন, ‘হে নবী! আমি আপনার প্রতি সর্বসুন্দর কাহিনি বর্ণনা করেছি। এ কুরআন আমার ওহী হিসেবে তোমার কাছে প্রেরণ করার মাধ্যমে।’ (সূরা ইউসুফ, আয়াত: ২)।
এইসব গল্পের মধ্যে আল্লাহর অস্তিত্বের প্রমাণ, নবী-রাসূলদের নবুয়তী জীবন, স্রষ্টার প্রতি অবাধ্য জাতির শাস্তি, মৃত্যুপরবর্তী জীবনের (পরকাল) প্রমাণপঞ্জী চমৎকার আঙ্গিক ও শৈল্পিক উপমায় উল্লেখ করা হয়েছে। কুরআনের গল্পগুলো অনেক উন্নতমানের শিল্পসুষমায় ভরা। এই গল্পগুলো একদিকে শিল্পগুণে সমৃদ্ধ, অপরদিকে সত্যের সুস্পষ্ট বার্তাবাহী। এগুলো নিছক কল্পনাপ্রসূত কথাসাহিত্য নয়। এই কাহিনীগুলোর সবই মানব ইতিহাসে ঘটে যাওয়া বাস্তবতা। কুরআনের গল্পগুলো সত্য ও বাস্তবতাকে এমন আলঙ্কারিকভাবে বর্ণনা করেছে যে, একজন পাঠককে খুব সহজেই আকৃষ্ট করতে সক্ষম। গল্পগুলোতে মানুষের জন্যে আদর্শ স্থাপনের লক্ষ্যে এবং সঠিক হেদায়েতের পথ প্রদর্শনের জন্যে বিভিন্ন চরিত্রকে প্রতিস্থাপন করা হয়েছে।
কুরআনে বর্ণিত গল্পের সংখ্যা নিয়ে মতভেদ রয়েছে। তাফসীরকারকদের একটি বর্ণনায় পাওয়া যায়, কুরআনে বর্ণিত গল্পের সংখ্যা ১১৬টি। গবেষকগণ কুরআনের গল্পগুলো বিশ্লেষণ করে বিভিন্ন ধরন বা পদ্ধতির কথা বলেছেন। তাঁদের অনেকেই গল্পগুলোকে নবীদের আবির্ভাবকালের দিক থেকে বর্ণনা করেছেন। তাই গল্পগুলো হযরত আদম (আ) থেকে শুরু হয়ে সর্বশেষ নবী মুহাম্মদ (সা.) এর জীবনকাহিনী বর্ণনার মধ্য দিয়ে শেষ হয়েছে। কুরআনের গল্পগুলোর আরেকটি পদ্ধতি হলোÑ কুরআনে বর্ণিত অক্ষুন্ন ধারা যা বিভিন্ন সূরার সন্নিবেশ অনুযায়ী বর্ণিত হয়েছে। এই পদ্ধতিতে কুরআনের আয়াত এবং সূরার শানে নুযুলের ভিত্তিতে গল্পগুলো পর্যালোচিত হয়।
আকার-আকৃতির দিক দিয়ে কুরআনে বর্ণিত গল্পগুলোকে প্রধানত ৩ ভাগে ভাগ করা যায়। যথা;
১. বড় বা দীর্ঘ গল্প। আধুনিক সাহিত্যের ভাষায় এগুলোকে উপন্যাসও বলা যায়। যেমন; হযরত ইউসুফ (আ), হযরত মুসা (আ) এর গল্প। বড়ো গল্পগুলোর মধ্যে বহু দৃশ্যায়ন এবং একই বৃত্তে থেকেই উপস্থাপিত হয়েছে। পুরো সূরা ইউসুফেই এই নবীর জীবনের গল্প বর্ণনা করা হয়েছে। কোনো আলোচনা এই কাহিনীর বৃত্তের বাইরে যায়নি। একইভাবে সূরা কাসাসেও হযরত মুসা (আ) এর জীবনের কাহিনী বর্ণিত হয়েছে। এই ধরনের গল্পে শৈশব, কৈশোর, জীবনের গুরুত্বপূর্ণ দিক, নবুয়ত লাভÑ এভাবে ধারাবাহিক বর্ণনা উপস্থাপিত হয়েছে।
২. নাতিদীর্ঘ গল্প। যেমন; হযরত আদম (আ) (সূরা আল-ইমরান, মায়িদা, আরাফ), সূরা নূহে হযরত নূহ (আ), সূরা আম্বিয়া ও সূরা সাবায় হযরত দাউদ (আ) এর কাহিনী ইত্যাদি। এসব গল্পে দৃশ্যান্তর খুব বেশি নয়। তাঁদের রেসালাতের শুরু দিয়ে গল্পের অবতারণা হয়েছে আর একত্ববাদের দাওয়াত প্রদান এবং তৎসংশ্লিষ্ট বিষয় আলোচনার মধ্য দিয়েই এগিয়ে গেছে পরিসমাপ্তির দিকে। এই শ্রেণীর গল্পে নবীদের শৈশব, কৈশোরকাল বা তাঁদের বেড়ে ওঠার কোনো বর্ণনা নেই।
৩. ছোটগল্প। যেমন; হযরত সালেহ (আ) এর গল্প (সূরা আরাফ, সূরা হুদ ও সূরা শুয়ারা), সূরা মারিয়ামে হযরত যাকারিয়া (আ) এর গল্প। এসব গল্পে তাঁদের নবুয়তীকালের বর্ণনা রয়েছে এবং খুব সংক্ষিপ্ত ইঙ্গিত প্রদানের মধ্য দিয়েই গল্পগুলোর সমাপ্তি ঘটেছে। একইভাবে সূরা কাহফে গুহাবাসীর গল্প, সূরা হূদে মাদিয়ান, লুত, আদ ও সামুদ জাতির ধ্বংসের কাহিনী ইত্যাদি। ছোটগল্পের বৈশিষ্ট্যের মতো এ গল্পগুলো ‘শেষ হয়েও হইলো শেষ’।
কুরআনের গল্পগুলোতে গভীরভাবে মনোনিবেশ করলে আমরা দেখতে পাবো- তৎকালীন আরব সমাজে রূপকথা বা কল্প-মিশ্রিত পৌরাণিক কাহিনীর যে ধারা প্রচলিত ছিল কুরআনের গল্পে সেসব একেবারেই অনুপস্থিত। বরং মানব সৃষ্টির সূচনালগ্ন থেকেই শেষ নবী হযরত মুহাম্মদ (সা.) পর্যন্ত ঘটে যাওয়া বাস্তব ঘটনাগুলো রাসূলকে অবহিত করেছেন স্বয়ং আল্লাহ।
অতএব, আমাদের এমন গল্প রচনা করা উচিত নয় যেগুলো শুধুই গল্পের জন্যই গল্প। যাতে নেই কোন শিক্ষা। নেই কোন বার্তা। নেই হেদায়াতের আলো। বরং সত্য ও সুন্দর পথের পাথেয়, বাস্তবধর্মী, ইসলাম ধর্মের অপরিপন্থী, হেদায়াতের আলোকবর্তিকাপূর্ণ গল্প-কাহিনী নির্মাণ করা উচিত। সর্বপরি মানুষকে পথভ্রষ্ট করার জন্য যা কিছুই করা হোক না কেন তা হারাম। তা কবিতা হোক, গান হোক বা গল্প-উপন্যাস।
লেখক: সালমান রিয়াজ, সাংবাদিক ও কলাম লেখক
তথ্যসূত্র:
১. আল-কুরআন।
২. কুরআন ও হাদীসের আলোকে কবি ও কবিতা, মতিউর রহমান মল্লিক, জুন ২০২৩।
৩. মুসলিম সঙ্গীত চর্চার সোনালী ইতিহাস, এ. জেড. এম. শামসুল আলম, ফেব্রুয়ারি ২০১২।
.jpg)
No comments