Header Ads

Header ADS
তুরস্কে বিভক্তি আরও বাড়বে
সোনের কাগাপতাই    |    
প্রকাশ : ১৯ জুলাই, ২০১৬ 
তুরস্কের ক্ষমতাসীন জাস্টিস অ্যান্ড ডেভেলপমেন্ট পার্টিকে (একে) ক্ষমতাচ্যুত করতে সেনা অভ্যুত্থানের প্লট কে তৈরি করেছে তা আমাদের জানা নেই। এ অভ্যুত্থানচেষ্টার ফলে দেশটির প্রেসিডেন্ট রিসেফ তাইয়েপ এরদোগান বুঝতে পেরেছেন, স্বাধীনতা ও গণতন্ত্রের হুমকির মধ্যে রয়েছে তুরস্ক। যদি সামরিক শক্তি বিজয় লাভ করত, তবে তুরস্ক সেনাপ্রধানের দ্বারা একটি শোষণের রাষ্ট্রে পরিণত হতো। আর এরদোগানের জয়ে এখন দেশটি গণতান্ত্রিক শাসকের মাধ্যমে আরও শোষণের দিকে ধাবিত হল।
২০০৩ সালে ক্ষমতার আসনে বসার পর থেকে স্বৈরাচারী স্টাইলে দেশ শাসন করে যাচ্ছেন এরদোগান। তুমুল জনপ্রিয়তার সুযোগ নিয়ে তুর্কিদের ওপর প্রতাপশালী ‘নয়া সুলতান’ হিসেবে আবির্ভূত হয়েছেন তিনি। বিশেষ করে বিরোধী মত দমন ও গণমাধ্যম নিয়ন্ত্রণের অভিযোগে পশ্চিমা বিশ্বে ব্যাপক সমালোচিত এরদোগান। তাছাড়া ভিন্নমত পোষণকারীদের দমন, বাকস্বাধীনতা খর্ব, সমাবেশ ও সংগঠনের অধিকার থেকে সাধারণ মানুষকে বিরত রাখার মতো অভিযোগ রয়েছে তার বিরুদ্ধে। প্রাথমিকভাবে ইউরোপীয় ইউনিয়নে (ইইউ) একটি অর্থনৈতিক প্লাটফর্ম গঠনের দাবিতে সংস্কারের জন্য ২০০৭ ও ২০১১ সালে ইলেক্টোরাল বিজয়ের মাধ্যমে এরদোগান আরও প্রভাবশালী রক্ষণশীল ও স্বৈরাচারী শাসকে পরিণত হন।
এরদোগানের নির্বাচনী সাফল্য যদি ইতিবাচক অর্থনৈতিক কর্মক্ষমতার মাধ্যমে হয়ে থাকে, তাহলে তার অন্যান্য পৈশাচিক কৌশলগুলো তার পক্ষে ভোট পাওয়ার জন্য সহায়ক হিসেবে কাজ করেছে। গণতান্ত্রিক গোষ্ঠী যেমন- গাজী পার্কে বিক্ষোভকারী, বামপন্থী ও উদারপন্থী, ধর্মনিরপেক্ষ, সামাজিক গণতন্ত্রপন্থী, উদার আলেভি মুসলিম ও কুর্দিদের ওপর সহিংস অভিযানের মাধ্যমে নির্বাচনী বিজয় অর্জন করেছিলেন এরদোগান। তিনি একজন স্বৈরাচারী ব্যক্তি হিসেবে সমাজে ধর্মপূজারির ব্যক্তিত্বে স্থান গেড়ে বসেছেন। তার কর্তৃত্বকে যে-ই খর্ব করার চেষ্টা করেছে, তার ওপরই সহিংস আক্রোশ প্রকাশ করেছেন তিনি।
এভাবে তিনি রাজনৈতিকভাবে বিরোধী দলের সফল লক্ষ্যবস্তুতে পরিণত হয়েছেন। এ জন্য দেশের সম্মিলিত জনসংখ্যার প্রায় অর্ধেক প্রেসিডেন্ট হিসেবে তার কার্যক্রমকে ঘৃণার চোখে দেখে। অন্য অর্ধাংশ, যারা ডানপন্থী, উদার ও ইসলামিক ভাবধারাপুষ্ট তারা এরদোগানকে সমীহ করে। ২০১১ ও ২০১৫ সালের নির্বাচনে এরদোগানের একে পার্টি ৪৯ দশমিক ৫ শতাংশ ভোট পেয়ে জয়লাভ করে। ২০০৮ সালে ধর্মনিরপেক্ষতাবাদী সামরিকদের বিরুদ্ধে ‘এরগেনেকোন মামলা’ চালু করেন এরদোগান, যা বর্তমানে ব্যাপক সমালোচিত একটি বিষয়। এ মামলার মাধ্যমে সেনাবাহিনীর একটি অংশ সরকারবিরোধী অভ্যুত্থানের চেষ্টা চালাচ্ছে- এমন অভিযোগ এনে বিচারকার্য চালানো হয়। ‘এরগেনেকো’ নামে পরিচিতি পাওয়া এ ষড়যন্ত্র মামলায় অভিযুক্ত ছিলেন ২৭৫ জন। অভিযুক্তদের মধ্যে সাবেক সেনাপ্রধান ইলকার বাসবাগের থেকে শুরু করে বেশ কয়েকজন উচ্চপদস্থ সেনা কর্মকর্তা, সরকারি কর্মকর্তা, আইনজীবী, শিক্ষাবিদ ও সাংবাদিক রয়েছেন। মূলত এ মামলার মাধ্যমে দেশের ধর্মনিরপেক্ষ প্রতিপক্ষ, গণমাধ্যমকর্মী ও সুশীল সমাজের মাথাগুলোকে শাস্তি দেয়াই তার লক্ষ্য ছিল। জেলে বন্দি করা হয় শত শত নাগরিককে।
এরগেনেকোন মামলার তদন্তে গঠিত প্রসিকিউটর সরকারের বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্রের কোনো প্রমাণ পায়নি। ফলে ২০১৬ সালে আপিল আদালত ওই আদেশ বাতিল করে দেন। আদালতের রায়ে বলা হয়, এরগেনেকোন নামে কোনো গোষ্ঠীর অস্তিত্বই প্রমাণ করতে পারেনি সরকার। এর আগে ২০১১ সালে সেনা কর্মকর্তারা পদত্যাগ করেন। বলা হতো, ওই বিদ্রোহী সেনা কর্মকর্তারাই তুরস্কে আবার সেনা অভ্যুত্থানের চেষ্টা চালাবেন। সেটাই আদতে সত্যে পরিণত হল। এরদোগানের বিরুদ্ধে ব্যর্থ এ অভ্যুত্থান ওই সূত্র ধরেই আবির্ভূত হয়েছে। এরদোগান ও তার সমর্থকরা এখন জানেন, ষড়যন্ত্রের নকশা আগের থেকে আরও শক্তিশালী হয়েছে।
এটি তুর্কি গণতন্ত্রের জন্য একটি খারাপ খবর। এরদোগানের বিরুদ্ধে অভ্যুত্থানের ষড়যন্ত্রকারীদের একটি বৈধ পন্থায় সরানো, এমনকি সব ভিন্নমত ও বিরোধীদেরও দমন করা হবে। ভবিষ্যৎ সেনা অভ্যুত্থান রুখতে এরদোগান সমর্থকরা দেশের ওপর নির্যাতন মাথা পেতে নেবে। যখন বিরোধীদের ওপর নির্যাতন চরমে পৌঁছবে, তখন গণতান্ত্রিকভাবে এরদোগানের পতন ঘটানো হবে। কুর্দিস্তান ওয়ার্কার্স পার্টির (পিকেকে) মতো দলগুলো আরও সহিংস হবে। ফলে এ সংকটাপন্ন অবস্থার মাধ্যমে আরেকটি নির্বাচনের দিকে ঝুঁকবে দেশ। সামগ্রিকভাবে দেশের স্থিতিশীলতার জন্য উদ্বেগজনক বিষয় হল- অভ্যুত্থানচেষ্টায় সামরিক বাহিনীর একটি অংশ জড়িত। এটি এমন একটি প্রতিষ্ঠান, যারা আগেও অভ্যুত্থান, তিক্ত বিদ্রোহ এবং এরগেনেকোন ট্রাজেডির সাধ পেয়েছে।
তুরস্কের এ অভ্যুত্থানচেষ্টা দেশটিতে সামাজিকভাবে অনেক ক্ষত সৃষ্টি করবে। এ ব্যর্থ অভ্যুত্থানচেষ্টা তুরস্ককে অন্ধকার সময় হিসেবে খ্যাত ১৯৭০ সালের দিকে ধাবিত করবে, যখন ডানপন্থী-বামপন্থী জঙ্গি গ্রুপ ও নিরাপত্তা বাহিনীর মধ্যে গৃহযুদ্ধের সূত্রপাত হয়েছিল। নিহত হয়েছিল হাজার হাজার মানুষ। যদিও এরদোগান সাম্প্রতিক সময়ের ঐক্যবদ্ধ রাষ্ট্রে আবির্ভূত হয়েছেন, বিভাজনের সমাজে নয়। এরদোগানের জন্য চ্যালেঞ্জ ছিল আগের সহিংস মানোভাব দূর করে সংবিধান সংশোধন, নির্বাহী ও বিচার বিভাগের স্বাধীনতা প্রতিষ্ঠা করা। এসব তাক লাগানো কাজ করেই একে পার্টির চেয়ার দখল করেছেন তিনি। হয়েছেন মুসলিম সংখ্যাগরিষ্ঠ দেশ তুরস্কের প্রধানমন্ত্রী ও প্রেসিডেন্ট। স্থিতিশীল এ দেশটিতে মাত্র ৬ মাস আগে পিকেকে পার্টি ও আইএসের সন্ত্রাসী হামলার পর এ অভ্যুত্থানের চক্রান্ত তুরস্ককে আরও বিভক্ত করবে। এর ফলে এরদোগান সমর্থক ও বিরোধীদের মধ্যে সহিংসতা আরও বাড়বে। এ সুযোগে আইএস হামলার সুযোগ খুঁজবে। এরদোগান তুরস্ককে বিপর্যয়ের কিনার থেকে তুলে অভ্যুত্থান সফল হওয়ার আগেই দেশকে গণতন্ত্রের আসনে দাঁড় করিয়েছেন। যারা এ অভ্যুত্থান শুরু করেছিল তারা তুরস্ককে রসাতলে নিয়ে যেত। তবে এ ঘটনা নেতাদের এখন এমন একপর্যায়ে নিয়ে যাবে, যার ফলে বিপর্যয় থেকে তুরস্ককে উদ্ধারের ক্ষমতা তাদের আর থাকবে না।

ওয়াশিংটন পোস্ট থেকে ভাষান্তর : সালমান রিয়াজ
সোনের কাগাপতাই : ওয়াশিংটন ইন্সটিটিউট ফর নিয়ার ইস্ট পলিসির সিনিয়র ফেলো
http://www.jugantor.com/window/2016/07/19/46132/%E0%A6%A4%E0%A7%81%E0%A6%B0%E0%A6%B8%E0%A7%8D%E0%A6%95%E0%A7%87-%E0%A6%AC%E0%A6%BF%E0%A6%AD%E0%A6%95%E0%A7%8D%E0%A6%A4%E0%A6%BF-%E0%A6%86%E0%A6%B0%E0%A6%93-%E0%A6%AC%E0%A6%BE%E0%A7%9C%E0%A6%AC%E0%A7%87



No comments

Powered by Blogger.