Header Ads

Header ADS
দক্ষিণ চীন সাগর নিয়ে কুরুক্ষেত্র
   গ্যারেথ ইভানস |    
প্রকাশ : ০৪ আগস্ট, ২০১৬
দক্ষিণ চীন সাগর ইস্যুতে ইউনাইটেড নেশন কনভেনশন অন দ্য সি অব দ্য ল’কে (ইউএনসিএলওএস) ভিত্তি করে ফিলিপাইনের করা মামলার রায়ে হেগের স্থায়ী সালিশি আদালত বা পার্মানেন্ট কোর্ট অব আর্বিট্রেশন (পিসিএ) বেইজিংয়ের বিরুদ্ধে রায় দিয়েছে। এতে বিস্মিত হয়নি কেউই। ট্রাইব্যুনালের এ রায়ে হৃদয় ভেঙে গেছে চীনের। দক্ষিণ চীন সাগরে দীর্ঘদিনের দাবি থেকে ছিটকে পড়তে হচ্ছে বেইজিংকে। পিসিএ রায় দিয়েছে, ১৯৪০ সালের ‘নাইন ড্যাশ লাইন’-এর মাধ্যমে দক্ষিণ চীন সাগরে চিত্রিত চীনের ৮০ শতাংশের মালিকানার কোনো ভিত্তি নেই। এর দ্বারা এটা স্পষ্ট যে, সম্প্রতি চীনের সমুদ্রসীমানার দাবি, সেখানকার রিফগুলোতে সামরিক মহড়া, কৃত্রিম দ্বীপ বানানোর চেষ্টা, আশপাশের জলসীমানায় নৌকা চালনা বা বিমান উড়ানোর কোনো অধিকার বেইজিংয়ের নেই।
‘নাইন ড্যাশ লাইনে’র মানচিত্র কী উদ্দেশে অংকিত হয়েছে, চীনের সরকারি বিবৃতির মাধ্যমে কখনোই তা স্পষ্ট হয়নি। কেউ কেউ এটাকে চীনের ‘ঐতিহাসিক অধিকার’, আবার কেউ ‘চীনের প্রথাগত মাছ ধরা অঞ্চল’ বলেছেন; আবার অন্যদের মতে, দক্ষিণ চীন সাগরে বেইজিংয়ের নিছক সার্বভৌমত্বের দাবি প্রতিষ্ঠিত হয়েছে। কিন্তু এর দ্বারা অন্য অঞ্চলগুলোকে প্ররোচিত করা হয়েছে। চীনের স্বেচ্ছায় মাছ ধরার অধিকারে সীমা লংঘন (ইন্দোনেশিয়ার সঙ্গে), প্রাকৃতিক সম্পদ আহরণে অনধিকার চর্চা (ভিয়েতনামের সঙ্গে)- এসব কারণে নিজেদের অধিকার সচেতনতার প্রশ্ন দেখা দিয়েছে।

পিসিএ’র সিদ্ধান্তের আলোকে এটা স্বীকৃত যে, ঐতিহাসিক বা প্রথাগত জলসীমানার দাবিতে সার্বভৌমত্বের মালিকানা পাওয়া আন্তর্জাতিক আইনের বহির্ভূত। বাসযোগ্য দ্বীপ, মূল ভূখণ্ডের সীমানাসহ ১২ নটিক্যাল মাইলের সামুদ্রিক সীমানা, ২০০ নটিক্যাল মাইলের বিশেষ অর্থনৈতিক অঞ্চল (ইইজেড) এবং মহীসোপান এলাকার সীমানা এ আইনের মধ্যে অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে। বাস-অযোগ্য শীলা দ্বীপ ও স্থায়ী রিফগুলোসহ ১২ নটিক্যাল মাইলের জলসীমানাও এর অন্তর্ভুক্ত। এর বেশি কিছু নয়। ভূমি ছাড়া সমুদ্রসীমানার কোনো অধিকার আরোপ করতে পারে না কোনো রাষ্ট্র। তবে এ রায়কে তোয়াক্কা না করে এখন মালিকানার লাগাম ধরে রেখেছে চীন। দাবির স্বপক্ষের রাষ্ট্রকে হুমকি দিচ্ছে বেইজিং। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রও সমঝোতার ছলে শাসাচ্ছে চীনকে। ফলে এ সাগরটি এশিয়ার কুরুক্ষেত্র হিসেবে আবির্ভূত হতে যাচ্ছে।

ভিয়েতনাম, ফিলিপাইন বা অন্য কোনো দেশের সঙ্গে ভূমির দাবিতে প্রতিযোগিতা বা দাবি অব্যাহত রেখেছে চীন। বাসযোগ্য দ্বীপ, স্থায়ী পাথর দ্বীপ, স্পার্টলি ও প্যারাসেল দ্বীপপুঞ্জের সার্বভৌমত্বের দাবি না তুলে অবস্থান আরও দৃঢ় করেছে বেইজিং। এটা বৈধ কোনো পন্থা হতে পারে না। চীন যখন তার নিজের উপকূলীয় সীমানা যোগ করবে, তখনই দক্ষিণ চীন সাগরে বেইজিং একটি বৃহদংশ ও সম্পূর্ণরূপে গ্রহণযোগ্য অংশ অর্জন করতে সক্ষম হবে। কিন্তু ফিলিপাইনের মামলায় এ ধরনের সার্বভৌম কোনো ইস্যুতে আলোকপাত করেনি পিসিএ। এমনকি দক্ষিণ চীন সাগরে চীনের সার্বভৌম দাবি নেগোসিয়েশন, আর্বিট্রেশন ও অ্যাডজুডিকেশনের মাধ্যমে সমুদ্রসীমানা, বিশেষ অর্থনৈতিক অঞ্চল ও মহীসোপান অঞ্চলসহ সমুদয় এলাকা ‘নাইন ড্যাশ লাইন’ বেষ্টনীর মাধ্যমে একদিন বেইজিংয়ের নিয়ন্ত্রণে ছিল।
পিএসএ’র সিদ্ধান্তকে নাকচ করেছে চীন। কারণ ওই সাগরে দেশটির নির্মাণাধীন কার্যক্রম, সামরিক গ্রেড বিমানবন্দর, যোগাযোগ সুবিধা ও অস্ত্রের সরবরাহের দিকে নজরে রেখে এ রায়কে উড়িয়ে দিয়েছে চীন। দক্ষিণ চীন সাগরের স্পার্টলি দ্বীপপুঞ্জের সাতটি প্রবাল দ্বীপে এ ধরনের নির্মাণ কাজ চালু করেছে চীন। সেগুলো হল- মিশচিফ রিফ, সুবি রিফ, গাভেন রিফ, হাগস রিফ (আগে পুরোটাই জোয়ারে নিমজ্জিত ছিল), জনসন সাউথ রিফ, কুয়ারটিরন রিফ এবং ফিয়ারি ক্রস রিফ (আগে জোয়ারে নিমজ্জিত ছিল, বসবাসের অযোগ্য)। ইউএনসিএলওএস আইন অনুযায়ী, নিজেদের বিশেষ অর্থনৈতিক অঞ্চল এবং উচ্চ সমুদ্রের মধ্যে শান্তিপূর্ণ সমঝোতার মাধ্যমে কৃত্রিম দ্বীপ বানাতে পারবে যে কোনো দেশ। ‘শীলা দ্বীপে’র মধ্যে একটি ‘প্রবাল দ্বীপ’ (১২ নটিক্যাল মাইলের মধ্যে এ দাবি অনুমতি পেতে পারে) এবং একটি ‘অবাসযোগ্য শীলা দ্বীপে’র (২০০ নটিক্যাল মাইলের ইইজেডের মধ্যে এ দাবি অনুমতি পেতে পারে) মধ্যে এ আইন প্রভাব ফেলতে পারে। ফিলিপাইনের মামলা এ মৌলিক নীতি অনুসরণ করেই হয়েছে।

পিএসএ ঠিক তা-ই করেছে। ফিলিপাইনের বিশেষ অর্থনৈতিক অঞ্চলের মধ্যে মিশচিফ রিফে নির্মাণ কার্যক্রম চালানো এবং সেই সীমানার দাবি প্রতিষ্ঠা করার কোনো অধিকার চীনের নেই। দক্ষিণ চীন সাগরে রিফ, শিলা দ্বীপ বা পায়ের আঙুলে ভর করে দাঁড়ানোর মতো কোনো জায়গা- সবই জেদের তাড়নায় সার্বভৌম মালিকানা প্রতিষ্ঠার চেষ্টা করছে চীন। আঞ্চলিক শান্তি নিশ্চিত করতে নেয়া উচিত নতুন করে পদক্ষেপ। এসব পদক্ষেপ হবে এমন- স্পার্টলি দ্বীপপুঞ্জের সাতটি নয়া কৃত্রিম দ্বীপে সামরিক কার্যক্রম সাময়িকভাবে থামিয়ে রাখা। স্কারবোরাগ শোলে কোনো ধরনের নতুন কার্যক্রম ত্বরান্বিত না করা। ‘নাইন ড্যাশ লাইন’ রেখার মাধ্যমে সার্বভৌমত্বের দাবি স্থগিত রাখা। একটি প্রকৃত আপসের দাবি উত্থাপন করা। এর মাধ্যমে বাস্তবিক সমাধান ও সমঝোতার পথ খুঁজে বের করা। দক্ষিণ চীন সাগরের দাবিদার সব দলের মধ্যে একটি ‘কোড অব কন্ডাক্ট’ গড়তে আসিয়ানের সঙ্গে সমঝোতায় অগ্রবর্তী হওয়া। এছাড়া এ ইস্যুতে আসিয়ানের বিভাজন ও অস্থায়িত্ব দূর করতে দুর্বলতম দেশ কম্বোডিয়া ও লাওসের ওপর চাপ সৃষ্টি করা।

দেশটি ইতিমধ্যে বিকল্প পন্থা হিসেবে পিপলস লিবারেশন আর্মির দ্বারা সাগরের জলসীমানায় সামরিক শক্তি ত্বরান্বিত করেছে। এছাড়া ইউএনসিএলওএস আইনকে কটাক্ষ করে দক্ষিণ চীন সাগরের পুরো আকাশ সীমানায় বিমান প্রতিরক্ষা শনাক্ত জোন (এডিআইজেড) গড়ার ঘোষণা দিয়েছে। এডিআইজেড গঠনের ঘোষণাকে উপেক্ষা করেছে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র। ভবিষ্যতের কোনো চিন্তাভাবনা ছাড়াই সামরিক মহড়া সহসাই বেড়ে যাবে। ইউএনসিএলওএস থেকে দূরে দূরে চলা এখন চীনের জন্য হবে চরম ভুল। চীন এখনও কার্যকরভাবে তার শর্তাবলী দ্বারা আবদ্ধ। এখনও প্রথাসিদ্ধ আন্তর্জাতিক আইন হিসেবে এটি স্বীকৃত। সর্বজনীন এটা মেনে চলা বাধ্যতামূলক। যদি চীন হার্ডলাইনে যায় আর পরবর্তী মামলা থেকে সরে আসতে না পারে, তবে মিশচিফ রিফ ও অন্যান্য কৃত্রিম দ্বীপে ১২ নটিক্যাল মাইলের ফ্রিডম অব নেভিগেশন যাত্রায় বাধ্যবাধকতা পাওয়া কষ্টসাধ্য হবে। কিন্তু এ মুহূর্তে সবার আঞ্চলিক স্বার্থ সুরক্ষা ও উত্তেজনা নিরসনে চীনকে কিছুটা সময় দিতে অবশ্যই সমন্বয় সাধন করা জরুরি।
প্রজেক্ট সিন্ডিকেট থেকে অনুবাদ : সালমান রিয়াজ
গ্যারেথ ইভানস : অস্ট্রেলিয়ার সাবেক পররাষ্ট্রমন্ত্রী ও আন্তর্জাতিক ক্রাইসিস গ্রুপের সাবেক প্রেসিডেন্ট

http://www.jugantor.com/sub-editorial/2016/08/04/50333/print

No comments

Powered by Blogger.