এশীয় গণতন্ত্রের নিরিখে ব্রেক্সিট
ইউরিকো কইকে |
প্রকাশ : ০২ জুলাই, ২০১৬
ইউরোপীয় ইউনিয়ন (ইইউ) থেকে বিচ্ছিন্ন হওয়ার প্রশ্নে গণভোট হয়েছে ব্রিটেনে। ইইউর সদস্য দেশগুলোর জনপ্রিয় গণভোটের দাবি তুললেই কি সব ধরনের জট খুলে যাবে? প্রায় সাত দশকেরও বেশি সময় ধরে ন্যাটো কি ইউরোপের নিরাপত্তার চাবিকাঠি? না, আদতে সেখানে ভাঙন দেখা দিয়েছে। ব্রিটেনের দেখাদেখি কি একে-অপরের দোষারোপে সরব হয়েছে ইইউভুক্ত দেশগুলো?
সালে নেভিলে চ্যাম্বারলিনের কেন্দ্রীয় ইউরোপ সম্পর্কিত লেখার মাধ্যমে এশিয়ার অধিকাংশ মানুষের মনে এমন প্রশ্ন এখন আর উঁকি দেয় না। দূরবর্তী এসব দেশের সমস্যাগুলো নিয়ে তারা খুবই অজ্ঞ ও স্বল্প সচেতন। কিন্তু এটি সত্য, পশ্চিমের জনপ্রিয়তার ঢেউ এশিয়ার তটকেও আন্দোলিত করে তুলেছে। বৃহত্তর অনৈক্য এ অঞ্চলের জন্য হুমকির কারণ হয়ে দেখা দিয়েছে। কারণ পশ্চিমা সাংবিধানিক কাঠামো ও আঞ্চলিক পক্ষাঘাত শোষণের ঘাটতি রয়েছে এখানে। সম্প্রতি দক্ষিণ চীন সাগর ইস্যুতে চীনের বিরুদ্ধে আসিয়ান জোটের অ্যাকশন এশিয়ার যৌথ নিরাপত্তা প্রক্রিয়ার নিরিখে অপরিপক্বতার দুঃখজনক একটি উদাহরণ।
এ অঞ্চলজুড়ে জাতীয় রেষারেষির মাত্রায় পরিপক্বতা নেই। ঐতিহাসিকভাবে অঞ্চলটি বিভাজনের বীজ বপন করে যাচ্ছে। তাই সব এশীয়দের এটা স্বীকৃতি দিতে হবে যে, যারা আইনের শাসনকে ভূলুণ্ঠিত করতে চায় তাদের পরাহত করতে এখানের দেশ ও অঞ্চল স্বাবলম্বী নয়। এছাড়া বর্তমানের শান্তি ও সমৃদ্ধির বিদ্যমান কাঠামো এখানে তুচ্ছ ও ক্ষীণ। ব্রেক্সিট থেকে এশিয়াকে অবশ্যই বার্তা নিতে হবে। একটি সহজ সংখ্যাগরিষ্ঠতার মাধ্যমে ‘লিভ শিবির’ ঐক্যবদ্ধ গেরো আটতে সক্ষম হয়েছে। এর ফলে বহু মানুষের স্বাধীনতা, নিরাপত্তা ও সাফল্যের চাবিকাঠি নিশ্চিত হল। এর ফলে দৃশ্যমান যে, যুদ্ধ-পরবর্তী উন্নত বিশ্বের হারানো ঐতিহ্য, প্রাচুর্যতা, স্বাধীনতা ও নিরাপত্তার আবির্ভাব হয়েছে।
দশ দশকেরও বেশি সময় ধরে বিশ্ব-গণতন্ত্র বিশেষ করে এশিয়া ও পশ্চিমা গণতন্ত্রের সফলতার ভিত্তি প্রশ্নাতীত। আমরা বুঝতে পেরেছি, আমাদের এক কাতারে দাঁড়াতে হবে। গণতন্ত্রের অংশীদারিত্বের স্বার্থে মাঝে-মধ্যে নিয়মতান্ত্রিক মৈত্রিতায় আবার মাঝে মধ্যে বাধ্যতামূলক ঐক্যবদ্ধতায় সারিবদ্ধ হতে হবে। আমরা বুঝতে পেরেছি, আইনের শাসন, রাজনৈতিক প্রতিষ্ঠানের মৌলিক অখণ্ডতা ও সমাজের সরলতার ওপর ভিত্তি করে আমাদের উন্নতি ত্বরান্বিত করতে হবে। আমেরিকার ডোনাল্ড ট্রাম্প ও ফ্রান্সের মেরিনে লে পেনের অকপটতা এবং লন্ডনের সাবেক মেয়র বরিস জনসন ও টরি আইনমন্ত্রী মাইকেল গভের রহস্যপূর্ণ ধাক্কায় এ ঐতিহাসিক বিজ্ঞতা এখন অবহেলিত হয়ে পড়েছে। তাদের পক্ষপাতদুষ্টতায় আসক্তও হয়েছে বহু ভোটার। ইইউ ইস্যুতে জনসন ও গভের সাজানো মিথ্যা নাটকের ফাঁদে পা দিয়েছে তারা।
এক ঐতিহাসিক পরিসংখ্যানের নিরিখে ইইউ বুঝতে সক্ষম হয়েছে, ব্যক্তিগত অধিকার, আইনের শাসন ও সামাজিক ন্যায়বিচারের ওপর ভিত্তি করে ইউরোপের ‘শান্তির অঞ্চল’ হিসেবে ইইউ প্রতিষ্ঠিত হয়েছে। এর পেছনে সবচেয়ে বড় কারণ ছিল, দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময়কালীন ইউরোপের অর্থনৈতিক ধসকে কাটিয়ে উঠতে পারা। এবং ইউরোপের প্রাচীন শত্রু জার্মানি ও ফ্রান্সের চেয়ে এ মহাদেশজুড়ে অভূতপূর্ব জীবনমান উন্নত করা। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের ভয়াবহতা, স্নায়ুযুদ্ধের অনিরাপত্তা ও ইউরোপিয়ান ইকোনমিক কমিউনিটির (ইইউর পূর্ব নাম) অর্থনৈতিক গতিশীলতায় বৃহত্তর রাজনৈতিক ভিশন ও ইচ্ছা পূরণে ইউরোপ সমন্বয়সাধনে সক্ষম হয়েছে। কিন্তু ব্রিটেনের ‘রিমেইন শিবির’ আক্ষেপ ও ক্ষোভ প্রকাশ করেছে। এ সমন্বয় ধরে রাখতে শুধু অর্থনৈতিক শক্তি নয় বরং ঐক্যের শক্তিকেও সুদৃঢ় করতে হবে। টেকসই এবং সুসংগঠিত কার্যসম্পাদনে ইউরোপের প্রয়োজন নতুন প্রেরণা ও নয়া উদ্দেশ্য সাধনের অনুভূতি।
বৈশ্বিক পুঁজিবাজারের মাধ্যমে অগাধ সামাজিক ও রাজনৈতিক পরিবর্তন সাধনের চেয়ে ঐক্য ও আত্মপরিচয় বর্তমানে এশিয়া ও পশ্চিমা অঞ্চলের জন্য অধিক প্রয়োজন। পূর্বের চেয়ে বাজার, জোগান ও উৎপাদন শৃংখল এশিয়ার সঙ্গে অঙ্গাঙ্গিভাবে জড়িত। জনগণের সার্বিক সহযোগিতার জন্য এসব উপাদান অতীব জরুরি। বর্তমানে ব্রিটিশ জনগণ তাদের একে-অপর ও ইউরোপের সাধারণ লক্ষ্য-উদ্দেশ্য থেকে ছিটকে পড়েছে। ইইউর অখণ্ডতা ও ন্যাটো সৃষ্টির অনুপ্রেরণায় তারা পশ্চিমাদের তাদের সামরিক কসরত দেখিয়ে বেড়াচ্ছে। ইউরোপের একতা যেমন ভবিষ্যতের প্রকল্প, তেমনি এশিয়ার গণতন্ত্র অবশ্যই আমাদের ভবিষ্যৎ কার্যসূচির অন্তর্ভুক্ত হবে। এশিয়ার গণতন্ত্রে ঐক্যের চেতনা ত্বরান্বিত করতে হবে; কিন্তু নাগরিকদের বুঝ শক্তির সীমার মধ্যে থেকেই এ কার্যসাধনে অগ্রসর হওয়াই শ্রেয়।
ইইউর সদস্যপদ ধরে রাখতে ব্যর্থ হয়েছে ব্রিটেনের সরকার। ব্রিটেন ও ইউরোপের অধিকাংশ সরকার প্রায় একই শক্তি এবং রীতিনীতি পালনে অভ্যস্ত। এ কারণেই মাশুল গুনতে হচ্ছে এখন। এশিয়া অবশ্যই এমন কোনো ভুল করবে না। এশিয়ার আঞ্চলিক ঐক্যের অনুভূতি বাড়াতে অঞ্চলটির জন্য কর্মদক্ষতা ও সাগ্রহ ইচ্ছার টেস্ট নেয়া উচিত। দক্ষিণ চীন সাগরের জলসীমানা নিয়ে চীনের বিস্তৃত দাবির বৈধতার প্রশ্নে আসন্ন সপ্তাহে হেগের স্থায়ী আদালতে রায় ঘোষিত হবে। আদালতের রায় যেটাই হোক, যদি স্থায়ী আদালতের বিরুদ্ধে দাঁড়াতে পারে এশিয়া, তবে তারা পারস্পরিক লক্ষ্য শেয়ারের অভিপ্রায়ে পৌঁছে যাবে। একে-অপরের কল্যাণে আইনের শাসন প্রতিষ্ঠা করতে পারবে। এই ধরনের শক্তপোক্ত ঐক্য ও সংহতি হমকির মুখে পড়লে সেটা দীর্ঘদিন আগের ইউরোপীয় একতাকে নষ্ট করে। এ ঐক্য পেতে এখন এশিয়ার পালা।
ইউরিকো কইকে : জাপানের সাবেক প্রতিরক্ষামন্ত্রী, বর্তমানে পার্লামেন্ট সদস্য
প্রজেক্ট সিন্ডিকেট থেকে অনুবাদ : সালমান রিয়াজ
http://www.jugantor.com/sub-editorial/2016/07/02/43071/%E0%A6%8F%E0%A6%B6%E0%A7%80%E0%A7%9F-%E0%A6%97%E0%A6%A3%E0%A6%A4%E0%A6%A8%E0%A7%8D%E0%A6%A4%E0%A7%8D%E0%A6%B0%E0%A7%87%E0%A6%B0-%E0%A6%A8%E0%A6%BF%E0%A6%B0%E0%A6%BF%E0%A6%96%E0%A7%87-%E0%A6%AC%E0%A7%8D%E0%A6%B0%E0%A7%87%E0%A6%95%E0%A7%8D%E0%A6%B8%E0%A6%BF%E0%A6%9F
No comments