তৃতীয় বিশ্বযুদ্ধ নিয়ে কেন মাতলেন ট্রাম্প?
অ্যানি অ্যাপলবাম | প্রকাশ : ০২ নভেম্বর, ২০১৬
২০১৪ সালের মার্চে ফিরে যাওয়া যাক, যখন রাশিয়া ক্রিমিয়ায় আক্রমণ করেছিল। রাশিয়ার সবচেয়ে বিখ্যাত রাষ্ট্রীয় টেলিভিশন এজেন্সি আন্তর্জাতিক পরিস্থিতির এ বর্ণনা সম্প্রচার করেছিল। রুশ সাংবাদিক দিমিত্রি কিসেলওভ টেলিভিশনের পর্দায় ঘোষণা করেছিলেন, রাশিয়া বিশ্বের একমাত্র দেশ, যেটি নিমিষেই যুক্তরাষ্ট্রকে তেজস্ক্রিয় ছাইয়ে পরিণত করতে পারে। তার এ বক্তব্যের কারণে পরমাণু হামলার আশংকায় মার্কিন প্রেসিডেন্ট বারাক ওবামার চুল ধূসর বর্ণ ধারণ করেছিল বলে মনে হয়। আমি স্বীকার করি যে, এটা কোনো কাকতালীয় বিষয় হতে পারে না। এরপর থেকেই হোয়াইট হাউস যে কোনো মুহূর্তে পরমাণু হামলার জন্য আতংকিত হয়েছে বলে মনে হয়।
২০১৬ সালের অক্টোবরে এসে রাশিয়ার রাষ্ট্রীয় টেলিভিশনের ওই সাংবাদিক কিসেলওভ আবারও টিভির পর্দায় হাজির হলেন। ৯ অক্টোবর এবার হুশিয়ারি দিলেন, রাশিয়ার দিকে পরমাণু হামলার উদ্ধত আক্রমণ টার্গেট করা হয়েছে। ওই প্রোগ্রামেও ওবামার ছবিযুক্ত খবর প্রকাশ করলেন তিনি। কিসেলওভ ঘোষণা দিলেন, যুক্তরাষ্ট্র ও রাশিয়ার মধ্যে সম্পর্কের ‘আমূল পরিবর্তন’ ঘটেছে। তিনি হুশিয়ারি বার্তা দিলেন, সিরিয়ায় যুক্তরাষ্ট্রের যে কোনো হস্তক্ষেপের প্রতিক্রিয়া জানাবে রাশিয়া। এমনকি প্রয়োজনে পরমাণু হামলার দিকেও ধাবিত হতে পারে। অন্য আরেকটি টিভি চ্যানেল সম্প্রচার করে, যদি সত্যিই কোনো একদিন এমনটি ঘটে, তবে আমাদের প্রত্যেকের আবাসস্থল হবে পাশে থাকা কোনো একটি বোমার সন্নিকটে। তখন আমরাই বুঝব আমাদের পরিণতি।
ওপরের এ দুই সালের মধ্যে কিঞ্চিত পার্থক্য রয়েছে। উভয়টি রাশিয়ার পরমাণু অস্ত্রের আখ্যান, তবে উপস্থাপনের ভাষাগত পার্থক্য রয়েছে। সময়ের ব্যবধানে দুটি দুই রকম। আমরা মার্কিন প্রেসিডেন্ট নির্বাচনের খুব কাছে অবস্থান করছি। সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হল, আমাদের রিপাবলিকান দলের একজন প্রেসিডেন্ট প্রার্থী রয়েছেন, যিনি রাশিয়ার রাষ্ট্রীয় গণমাধ্যমের কাছ থেকে প্রপাগান্ডা গ্রহণ করে তা মুহুর্মুহু ছড়াচ্ছেন। ডোনাল্ড ট্রাম্প ঘোষণা দিয়েছেন, ডেমোক্রেটিক দলের প্রেসিডেন্ট প্রার্থী হিলারি ক্লিনটন ও প্রেসিডেন্ট বারাক ওবামা ‘ইসলামিক স্টেট (আইএস) প্রতিষ্ঠা’ করেছেন। যে বিবৃতিটি সরাসরি রাশিয়ার রাষ্ট্রীয় নিউজ এজেন্সি স্পুটনিকের মাধ্যমে প্রচার করা হয়। ট্রাম্প রাশিয়ার ‘কন্সপাইরেসি থিউরিতে’ উৎসাহিত হন। স্পুটনিক আরও প্রচার করে, গুগল সার্চ ইঞ্জিন হিলারি সম্পর্কিত খারাপ বিষয়গুলো মুছে দেয়ার চেষ্টা করছে। ট্রাম্প তাতেও উচ্ছ্বসিত হন।
ট্রাম্প এখন কিসেলওভের হুমকি বারবার উচ্চারণ করছেন। গত সপ্তাহে তিনি বলেছিলেন, যদি আপনি হিলারি ক্লিনটনকে জয়ী করেন, তবে সিরিয়া ইস্যুতে তৃতীয় বিশ্বযুদ্ধের কবলে পড়বে গোটা বিশ্ব। কিসেলওভের মতোই ট্রাম্প উল্লেখ করেন, রাশিয়ার পরমাণু অস্ত্র রয়েছে। হিলারি যদি প্রেসিডেন্ট নির্বাচিত হন, সম্ভবত তা ব্যবহার করবে রাশিয়া। রাশিয়া পরমাণু শক্তিধর দেশ, কিন্তু একটি দেশের অস্ত্র অপর দেশের কথার বিরোধী কাজ করে। কেন রাশিয়ার রাষ্ট্রীয় গণমাধ্যম এ ধরনের ভাষার ব্যবহার করেছে? আর কেনই বা ট্রাম্প তা বারবার আওড়াচ্ছেন? তবে এর দ্বারা রুশ সরকারের উদ্দেশ্য খুব একটা অস্পষ্ট নয়, রাশিয়ার নাগরিকদের মধ্যে একটা ভয়ের সঞ্চার করা। ভাদিমির পুতিনের শাসনামলে দেশটির অর্থনীতিতে আগের চেয়ে ধস নেমেছে, জীবনমান অনেকটা হ্রাস পেয়েছে। ফলে রাশিয়ার শাসক চক্রের ষড়যন্ত্র হল, ক্ষমতাসীন প্রশাসনের শক্তির প্রচার করা আর জণগণকে শংকার মধ্যে রাখতে রাষ্ট্রীয় গণমাধ্যমগুলোকে এ কাজে ব্যবহার করা। এর দ্বারা দেশের নাগরিককে এটা বোঝানো যে, একমাত্র পুতিন সরকারই মার্কিন আগ্রাসন থেকে নাগরিকদের রক্ষা করতে পারবে।
রুশ শাসক আমাদের (মার্কিনি) ভীতির মধ্যে রাখতে চায় এবং বিশ্বাস করাতে চায়, তারা সিরিয়া ত্যাগ করবে। যদি যুক্তরাষ্ট্র ও ইউরোপ সরে আসে, তবে বাশার আল-আসাদ সরকারকে সাহায্য করা রাশিয়ার জন্য সহজ হয়, যেমনটি প্রায় এক দশকেরও বেশি সময় আগে চেচনিয়ার ক্ষেত্রে ঘটেছিল। লাখ লাখ মানুষ নিহত হয়েছেন, ভূমানচিত্র নিমিষেই মিশে গেছে এবং ধ্বংস হয়েছে সব রাজনৈতিক দল, ফলে রুশ সমর্থিত একনায়ক শাসকের নেতৃত্ব আবার শুরু হয়েছে। চেচনিয়া যুক্ত হয়েছে রাশিয়ার প্রজাতন্ত্র হিসেবে। অঞ্চলটি থেকে শরণার্থী হয়ে বহু মানুষ ইউরোপে পাড়ি জমিয়েছেন, বিস্তৃত হয়েছে রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক বিশৃংখলা। নিজেদের স্বার্থ রক্ষার জন্য এর সবই করেছে রাশিয়া।
মার্কিন নির্বাচনেও রাশিয়ার বৃহৎ স্বার্থ রয়েছে। গত গ্রীষ্মের পর থেকে রাশিয়ার হ্যাকাররা ডেমোক্রেটিক দলের ন্যাশনাল কনভেনশনের ই-মেইল হ্যাক করার চেষ্টা করে। এর দ্বারা এটা স্পষ্ট যে, রাশিয়া রিপাবলিকান দলের প্রার্থীর প্রতি ঝুঁকছে, যিনি বারবার তার বক্তব্যে আমেরিকার মিত্রদের বিরোধিতা এবং মস্কোর সমর্থনে কথা বলে আসছেন। আমার ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতা থেকে এটা বলতে পারি, রাজনৈতিক প্রযুক্তিবিদ, যারা সরকারের তথ্য প্রচারণার ছক আঁকেন, তারা ভালোভাবেই জানেন, ভয় এবং অতিরঞ্জিত আবেগ মানুষকে স্বৈরচারী শাসককে ভোট দিতে প্ররোচিত করতে পারে। মার্কিন নির্বাচনে ভয় এবং অতিরঞ্জিত আবেগ তৈরি হতে পারে না। যদি হয়, তবে এর জন্য নাগরিকদেরই তার মাসুল গুনতে হবে।
এ ছাড়া আরও সম্ভাব্য বহু উদ্দেশ্য থাকতে পারে রাশিয়ার। যাই হোক, ৮ নভেম্বরের ফলাফলের ওপরই বেশ কিছু রাজনৈতিক অনিশ্চয়তা বিরাজ করছে। যেমন- কয়েক মাসের রাজনৈতিক বিড়ম্বনা, হোয়াইট হাউসের কর্মচারীদের পরিবর্তন, এমনকি সংঘাতের নেতিবাচক প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি করতে পারেন ট্রাম্প। এ ছাড়া ট্রাম্প প্রেসিডেন্ট হলে রাশিয়া আক্রমণাত্মক কিছু মুহূর্তও তৈরি করতে পারে, যেমন- ইউক্রেনের সীমানা দখল, ব্যালাস্টিক রাষ্ট্রের ওপর হামলা এবং মধ্যপ্রাচ্যেও বড় ধরনের সামরিক হস্তক্ষেপ। যদি এমনটা হয়, তবে পুতিন তার নাগরিকদের বৃহৎ যুদ্ধের জন্য প্রস্তুত করতে এবং বিশ্বের বাকি অংশ যাতে তাকে না থামাতে পারে সেজন্য প্রয়োজনীয় সাজসজ্জা তৈরিতে মনোনিবেশ করেছেন। এ ছাড়া জেনারেলদের মনস্থির করা এবং সৈন্যদের প্রস্তুত করার প্রয়োজন রয়েছে পুতিনের। আমি এ ব্যাপারে নিশ্চিত, ছোট পরিসরে হলেও পরমাণু যুদ্ধের দামামা বাজবেই।
ওয়াশিংটন পোস্ট থেকে অনুবাদ : সালমান রিয়াজ
অ্যানি অ্যাপলবাম : পুলিৎজার পুরস্কারপ্রাপ্ত লেখক ও মার্কিন সাংবাদিক

No comments