Header Ads

Header ADS
ব্রিটিশ গণতন্ত্রের পতন
কেনেথ রগফ    |    
প্রকাশ : ২৭ জুন, ২০১৬
অভিবাসী চাপকে ইস্যু করে ইউরোপীয় ইউনিয়নের (ইইউ) সদস্যপদ থেকে সরে আসার বিষয়টি দেশবাসীর সামনে উপস্থাপন করাটা ব্রিটেনের নেতাদের জন্য চরম বোকামির ছিল। বরং, ইইউ থেকে প্রস্থানের জন্য স্বল্প বাধাই ছিল শুধুমাত্র একটি সংখ্যাগরিষ্ঠতা। ৭০ শতাংশ ভোটার ভোট দেয়া- এর মানে এই নয় যে, লিভ শিবির ৩৬ শতাংশ ভোট পেছনে ফেলে জয়ী হয়েছে। এটা কোনো গণতন্ত্রের উদাহরণ নয়, এটা বিশ্ব প্রজাতন্ত্রগুলোর জন্য রাশিয়ার জুয়া। কোনো ধরনের উপযুক্ত ভারসাম্য ছাড়া এ পরিবর্তন দেশের সংবিধান সংশোধনের (যদিও ব্রিটেনের সংবিধান অলিখিত) চেয়েও ভয়ানক সিদ্ধান্ত।
এক বছরের মধ্যে এ গণভোটের পুনরাবৃত্তি করা উচিত নাকি ব্রেক্সিট সমর্থন পেতে পার্লামেন্টের সংখ্যাগরিষ্ঠতা প্রয়োজন? দৃশ্যত, না। ব্রিটেনের জনগণ কি আসলে জানত এ ভোটের প্রভাব কী হবে? কী উদ্দেশ্যে তারা ভোট দিচ্ছে? অবশ্যই না। বস্তুত, ব্রেক্সিটের ফলে বৈশ্বিক বাণিজ্য বা অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক স্থিতিশীলতার ওপর কোনো খারাপ পরিণতি সম্পর্কে অধিকাংশ ব্রিটিশের কোনো ধারণাই ছিল না। আমি খুবই শংকিত যে, এটা দেশটির জন্য দৃশ্যমান খারাপ চিত্রাংকন করতে যাচ্ছে কিনা।
পশ্চিমের নাগরিকরা শান্তিতে বসবাস করার জন্য ধন্য। পরিবর্তিত পরিস্থিতি ও অগ্রাধিকারের ভিত্তিতে বৈদেশিক সমস্যা ও গৃহযুদ্ধগুলো গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়ায় সুরাহা করা যেতে পারে। কিন্তু এর বিশেষত্ব কি হবে? এটা কি এখন অবাধ রয়েছে? গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়া কি পরিবর্তনীয় নাকি জাতি-নির্ধারক সিদ্ধান্ত? কোনো এক বৃষ্টির দিনে স্কুল ছুটির জন্য ৫২ শতাংশ ভোটই কি যথেষ্ট?
ব্রেক্সিটাররা এই খেলার চালু করেননি। ২০১৪ সালের স্কটল্যান্ড ও ১৯৯৫ সালের কিউবেক গণভোটের বিরাট নজির এটি। কিন্তু এখনও পর্যন্ত বন্দুকের চোঙের ভেতর বুলেট ঢুকিয়ে তাক করা বন্ধ হয়নি। এই খেলার নিয়ম পরিবর্তনে পুনর্বিবেচনার এখনই সময়। না হলে সংখ্যাগরিষ্ঠতার দোহাই দিয়ে গণতান্ত্রিক শব্দটি ব্যবহারে স্বেচ্ছাচারিতা শুরু হবে। ভালো-মন্দ যে কোনো সিদ্ধান্তের জন্য একটি সংখ্যাগরিষ্ঠ মতামতেই ভর করবে জনগণ। একটি মনগড়া সিদ্ধান্তের মাধ্যমে আধুনিক গণতন্ত্র রক্ষায় সংখ্যালঘুদের স্বার্থ সুরক্ষায় ভারসাম্য বিনষ্ট ও এর সর্বনাশা ফলাফল রুখতে কষ্টসাধ্য হয়ে পড়বে।
এটা স্পষ্ট যে, এর ফলে সংবিধান পরিবর্তনের চেয়ে একটি ব্যয়বহুল বিল পাস করাটা অতি সহজ হবে। তবুও মদ্যপানের জন্য বয়স কমিয়ে আনার চেয়ে একটি দেশ ভেঙে তার আন্তর্জাতিক মান ধরে রাখাটা তর্কসাপেক্ষ কম দাবিদার। ইউরোপ এমনি একটি ভোট ঝুঁকির মুখোমুখি হয়েছে। এমন সিদ্ধান্ত নেয়ার জন্য এর চেয়ে উত্তম পদ্ধতি কি আর নেই? এই ভোটের একাডেমিক ঐকমত্য আছে কিনা তা জানতে দ্বারস্থ হয়েছিলাম কিছু রাজনৈতিক বিজ্ঞানীদের কাছে। সংক্ষেপে তার উত্তর পেয়েছি, না।
বস্তুত, দেখা চোখে ব্রেক্সিট ভোট একটি সহজ-সাপ্টা ব্যালট সিদ্ধান্ত। কিন্তু এই লিভ ভোটের কারণে ব্রিটেনের ভবিষ্যতে কী অপেক্ষা করছে তার সত্যতা জানা নেই অধিকাংশেরই। এর মাধ্যমে আমরা বাস্তবিক অর্থে বুঝলাম যে, অধিকাংশ দেশ এখন ৫১ শতাংশ নাগরিকের ভোটকে জাতি-নির্ধারক সিদ্ধান্ত মেনে ‘সুপারমেজরিটি’ সাব্যস্ত করবে। এখানে বৈশ্বিক ফিগার ৬০ শতাংশকে তোয়াক্কা করা হবে না। কিন্তু সাধারণ নীতি হল, ন্যূনতম এ সংখ্যাগরিষ্ঠতা হতে হবে প্রমাণযোগ্য স্থায়িত্বের ভিত্তিতে। অদূর ভবিষ্যতে যার বিপক্ষে কোনো প্রশ্নের প্রাদুর্ভাব হবে না। একটি ক্ষুরতুল্য সংখ্যাগরিষ্ঠতা যেটি আবেগতাড়িত জেগে উঠেছে- এর ওপর ভিত্তি করে একটি দেশের মৌলিক ও অপরিবর্তনীয় পরিবর্তন ভবিষ্যৎ ভাঙন ডেকে আনতে পারে। যদিও ব্রেক্সিট গণভোটের পর ব্রিটেনের অর্থনীতি মন্দায় (পাউন্ডের দরপতন তাৎক্ষণিক প্রতিক্রিয়া মাত্র) পড়বে না, তবুও দেশের অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক অস্থিরতা বিরাজ করবে।
প্রাচীন সময়কাল থেকে সংখ্যাগরিষ্ঠদের শাসন শক্তি ও সংখ্যাগরিষ্ঠের সিদ্ধান্তের মধ্যে সামঞ্জস্য বজায় রাখতে চেষ্টা করে আসছে দার্শনিকরা। সংখ্যালঘূদের সিদ্ধান্ত শোনার পদ্ধতি উদ্ভাবনের চেষ্টা করতে থাকে, এর মানে এই নয়, সংখ্যাগরিষ্ঠদের সিদ্ধান্তকে উপেক্ষা করা। প্রাচীন গ্রিসের স্পার্টা নগরীর পরিষদগুলোতে প্রশংসার মাধ্যমে ভোট গণনা করা হয়। জনগণ তাদের পছন্দের অভিরুচিগুলো উপস্থাপন করেন ভোট কেন্দ্রের মুখ্য বিচারকের সামনে, তিনি তা মনোযোগ সহকারে শ্রবণ করেন। পরে একটি সিদ্ধান্তে পৌঁছানো হয়। এটা যদিও অপূর্ণ সিদ্ধান্ত, তবুও ব্রিটেনের যা ঘটেছে তার চেয়ে যৌক্তিক। স্পার্টার সিস্টার রাষ্ট্র এথেন্স প্রকৃত ঐতিহাসিক গণতান্ত্রিক সিদ্ধান্তের উদাহরণ, যেখানে সব ধরনের শ্রেণী সমান সংখ্যক ভোট প্রদান করেছিল। যদিও অবশেষে একটি সর্বনাশা যুদ্ধের সিদ্ধান্ত হয়। একটি স্বাধীন সংস্থাকে সর্বময় ক্ষমতা দিতে এথেনিয়ানরা দেখেছে।
ইইউ’র সদস্য পদের প্রশ্নে কী করা উচিত ছিল ব্রিটেনের? নিশ্চিতভাবে এটা নিয়ন্ত্রণ করা কঠিন ছিল। উদাহরণস্বরূপ, যদিও ব্রেক্সিট দরকার ছিল, দুই বছর ধরে একটি জনরায়ের জন্য অপেক্ষা করেছে দেশটি। কিন্তু এর আগে হাউস অব কমন্সে ৬০ শতাংশ ভোটের অনুসরণে ব্রেক্সিটের দিকে অগ্রসর হওয়াটা যৌক্তিক ছিল। এরপরও যদি ব্রেক্সিট হতো, তাহলে মনে করতে পারতাম, এটি দেশের এক খণ্ড জনগণের রায়ের তাৎক্ষণিক ক্রিয়া এটি।
ব্রিটেনের ভোট ইউরোপকে বিপর্যয়ের মধ্যে ফেলে দিয়েছে। অধিকাংশই তাকিয়ে ছিল বিশ্বের প্রতিক্রিয়া ও যুক্তরাজ্য কীভাবে তার নিজের ভাবমর্যাদা ফিরে পাবে তার ওপর। দেশের সীমান্তের মধ্যে কোনো কার্যক্রমকে দীর্ঘস্থায়ী করতে সাময়িক গণভোটের চেয়ে ব্যাপক সংখ্যাগরিষ্ঠতার প্রয়োজন রয়েছে। বর্তমান আন্তর্জাতিক বিশ্বে আদর্শ সংখ্যাগরিষ্ঠতার উদাহরণ আমরা দেখেছি, ‘একটি বিশৃংখলার সূত্র’। ব্রিটেন তার প্রকৃষ্ট উদাহরণ।
অনুবাদ : সালমান রিয়াজ, সাংবাদিক
কেনেথ রগফ : হার্ভার্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থনীতি বিভাগের অধ্যাপক

No comments

Powered by Blogger.