যুক্তরাষ্ট্রের গরিব নাগরিকদের সাহায্য করাই আমার ব্রত
হিলারি ক্লিনটন |
প্রকাশ : ৩১ অক্টোবর, ২০১৬
কংগ্রেস সদস্য জিম কলিবার্নের ‘১০-২০-৩০’ দারিদ্র্যবিরোধী পরিকল্পনার এ কৌশলে আমি ও টিম কেইন (হিলারির রানিংমেট) হলাম মডেল। ‘১০-২০-৩০’ পরিকল্পনাটি হল, ফেডারেল বিনিয়োগের ১০ শতাংশ জনসাধারণের জন্য ব্যয় হবে, যেখানে মোট জনসংখ্যার ২০ শতাংশ মানুষ ৩০ বছর ধরে দারিদ্র্যসীমার নিচে বসবাস করছে। যে কোনো সমাজের জন্য আসল বার্তা হল, কীভাবে আমরা আমাদের শিশুদের যত্ন নেই। তারা আমাদের দেশের সম্পদ, তাই কোনো শিশু দারিদ্র্যের কষাঘাতে বেড়ে উঠতে পারে না। পুরো আমেরিকায় একটি রাতও তারা ক্ষুধার তাড়না ও স্থানের সংকটে ঘুমাতে পারে না। তাদের জন্য আমাদের ভালো কিছু করার আছে।
সুযোগ রয়েছে কার্যকরী পরিকল্পনা গ্রহণের। যদি আমি যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট হিসেবে সম্মানিত হই, তবে আমার প্রথম কাজ হবে চিলড্রেন ডিফেন্স ফান্ডের জন্য একজন তরুণ ও উদ্যমী অ্যাটর্নি নিয়োগ দেয়া। তার আসল দায়িত্ব হবে মার্কিন শিশু ও অভিভাবকদের আইনি সহায়তা দেয়া। এটাই আমার নতুন প্রশাসনের প্রধান মিশন। সুসংবাদ হল, আমরা উন্নতির দিকে ধাবিত হচ্ছি। মার্কিন প্রেসিডেন্ট বারাক ওবামা ও দেশের জনগণের কঠোর পরিশ্রমের জন্য তাদের ধন্যবাদ। সাম্প্রতিক কয়েক দশকে বৈশ্বিক দারিদ্র্যের হার অর্ধেক কমে এসেছে। আদমশুমারি ব্যুরোর নতুন রিপোর্ট অনুসারে, ২০১৫ সালে যুক্তরাষ্ট্রে ৩৫ লাখেরও কম নাগরিক দারিদ্র্যসীমার নিচে বসবাস করছে।
মধ্যম আয়ের নাগরিক ৫ দশমিক ২ শতাংশ বেড়েছে, ফলে দ্রুতগতিতে আয় বৃদ্ধির নতুন রেকর্ড তৈরি হয়েছে। পরিবারের সব পরিসরে সবাই কম হলেও আয়ের দিকে ধাবিত হচ্ছে। আদমশুমারি রিপোর্টে এটা স্পষ্ট, পরিশ্রমের মাধ্যমে ক্ষুদ্রমানের বিজয় অর্জন করেছে মার্কিন নাগরিকরা। কোনো ধরনের নতুন ভুল ছাড়াই আমাদের আরও এগিয়ে যেতে হবে। এক সময় সারা দেশের বহু পরিবার বৃহৎ মন্দায় পড়ে বিধ্বস্ত হয়েছিল। ২৫ থেকে ৬০ বছর বয়সী নাগরিকদের প্রায় ৪০ শতাংশ মার্কিনির অন্তত এক বছরের দারিদ্র্যের অভিজ্ঞতা রয়েছে।
এসব পরিবারকে দারিদ্র্যের কুয়ো থেকে তুলে আনার একটাই পথ, ভালো বেতনের একটি চাকরি পাওয়ার বিষয়টি নিশ্চিত করা। প্রেসিডেন্ট হিসেবে আমার অগ্রাধিকারমূলক কাজের মূল বিষয় হবে দীর্ঘস্থায়ী, নিরপেক্ষ ও শক্তিশালী অর্থনৈতিক সমৃদ্ধি ত্বরান্বিত করা। ভালো বেতনের কর্মসংস্থান সৃষ্টিতে অবকাঠামো, উৎপাদন, প্রযুক্তি ও উদ্ভাবন, ক্ষুদ্র ব্যবসা এবং ক্লিন এনার্জি খাতে ঐতিহাসিক বিনিয়োগ বাড়াতে আমি ডেমোক্রেটিক ও রিপাবলিকানদের সঙ্গে সমন্বয় করে কাজ করব। এবং ন্যূনতম বেতন বৃদ্ধি ও নারীদের সমান পারিশ্রমিক পরিশোধের নিশ্চয়তা দিয়ে কঠোর পরিশ্রমের পুরস্কার নিশ্চিত করতে হবে।
আমরা যদি দারিদ্র্যের বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে নেই, তবে অবশ্যই স্বল্পমূল্যের আবাসন সুবিধার ব্যাপারে জাতীয় পর্যায়ে অঙ্গীকার দাঁড় করাতে হবে। এ প্রসঙ্গটি নির্বাচনের সময় আলোচনার বিষয় নয়, এটি একটি জাতীয় বিষয়। ১ কোটি ১৪ লাখ মার্কিন নাগরিকদের আবাসন নিশ্চিতকরণের চুক্তি, যেখানে তারা তাদের বেতনের অর্ধেক বাড়ি ভাড়া বাবদ ব্যয় করে থাকেন। অধিকাংশই তাদের সন্তানদের জন্য ভবিষ্যৎ সঞ্চয় করতে পারেন না। অবসরপ্রাপ্ত নাগরিকরা পরিবারের মাথার ওপর চেপে বসে থাকেন।
আমার পরিকল্পনা হল, ব্যয়বহুল এলাকাগুলোয় সাশ্রয়ী মূল্যে আবাসন সরবরাহ নিশ্চিত করতে মধ্যবিত্ত পরিবারগুলোর ওপর কর কমানো এবং সাধারণ জনগণের উন্নয়ন ত্বরান্বিত করা। তাই যদি আপনি ব্যয়বহুল কোনো শহরে বসবাস করেন, তবে সেখানে বাসযোগ্য স্থান ও চলাচলের সুবিধাসহ ভালো কর্মসংস্থান ও উচ্চমানের স্কুল পাবেন, যেখানে আপনার সন্তানকে স্বল্প খরচে শিক্ষিত করার সুযোগ পাবেন। আমরা আরও নিশ্চিত করতে চাই, বহু দশক ধরে যারা অবজ্ঞার মধ্যে দিনাতিপাত করছেন, তাদের কাছে আমাদের বিনিয়োগ পৌঁছানো।
আমরা স্বীকার করি, দেশে দারিদ্র্যের হার কমেছে, তবে অতি দরিদ্রের হার চরম বেড়েছে। কংগ্রেস সদস্য জিম কলিবার্নের ‘১০-২০-৩০’ দারিদ্র্যবিরোধী পরিকল্পনার এ কৌশলে আমি ও টিম কেইন (হিলারির রানিংমেট) হলাম মডেল। ‘১০-২০-৩০’ পরিকল্পনাটি হল, ফেডারেল বিনিয়োগের ১০ শতাংশ জনসাধারণের জন্য ব্যয় হবে, যেখানে মোট জনসংখ্যার ২০ শতাংশ মানুষ ৩০ বছর ধরে দারিদ্র্যসীমার নিচে বসবাস করছে। আমি বিশেষ করে ক্ষুদ্রগোষ্ঠীর প্রতি গুরুত্ব দিয়েছি, যাতে তারা দেশটির মধ্যে জেঁকে বসা দীর্ঘদিনের বর্ণবাদের শিকল ছিঁড়ে বেরিয়ে আসতে পারেন।
প্রেসিডেন্ট হিসেবে আমি শিশুদের সুযোগ-সুবিধা বৃদ্ধি এবং পরিবারের জন্য সুবিচারের নিশ্চয়তা অব্যাহত রাখব। আমাদের উচ্চমানের শিশু কেয়ার সেন্টার ও সবেতনে ছুটি সুবিধা বাড়ানো উচিত, যাতে সর্বস্তরের পিতা-মাতা তাদের বাহ্যিক জীবন ও কর্মসংস্থানের মধ্যে সমন্বয় করে দিনাতিপাত করতে পারেন। আমাদের শিশুদের কাছ থেকে সর্বোত্তম কিছু প্রত্যাশায় চার বছর বয়সী শিশুদের জন্য প্রি-স্কুলের সহজলভ্যতা নিশ্চিত করতে দ্বিগুণ বিনিয়োগ করা উচিত।
ডোনাল্ড ট্রাম্প আমার এসব নীতির বিপরীত সীমায় হাঁটছেন। তিনি আমেরিকাকে বিজয়ী ও পরাজিত- এ দুই ভাগে ভাগ করেছেন। এছাড়া তিনি দরিদ্রদের নিয়ে চিন্তা করে তার মূল্যবান সময় নষ্ট করতে চান না। বরং তার অর্থনৈতিক পরিকল্পনা ‘তেলা মাথায় তেল দেয়ার’ মতো ধনীদেরই লাভবান করবে। এমনকি এ নীতির ফলে তিনি তার নিজের পরিবারের সম্পদ থেকে ৪০০ কোটি ডলার কর দেয়া থেকে রক্ষা পাবেন। একটি নিরপেক্ষ অর্থনৈতিক বিশ্লেষণে দেখা গেছে, ট্রাম্পের অর্থনৈতিক এ নীতি যুক্তরাষ্ট্রের বিপর্যয় ডেকে আনবে, দেশকে মন্দায় ডোবাবে এবং বহু পরিবার দারিদ্র্যে পতিত হবে।
নভেম্বরে আমেরিকার নাগরিকদের দুটি অর্থনৈতিক ধারার মধ্যে একটিকে বেছে নিতে হবে। এর একটি দেশের প্রত্যেকের কল্যাণে কাজ করবে, অপরটি প্রত্যেকের ব্যয়ভার বাড়িয়ে দেবে। জনগণই তার ভালোটা পছন্দ করবে।
দ্য নিউইয়র্ক টাইমস থেকে অনুবাদ : সালমান রিয়াজ
হিলারি ক্লিনটন : মার্কিন নির্বাচনে ডেমোক্রেটিক দলের প্রেসিডেন্ট প্রার্থী, সাবেক ফার্স্ট লেডি ও পররাষ্ট্রমন্ত্রী

No comments